বাংলাদেশ ০১:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাইকগাছার নদী-নালা, খাল-বিলে বাড়ছে প্লাস্টিক দূষণ১০ ইউনিয়ন ও পৌরসভাজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা, সচেতনতা ও কঠোর নজরদারির দাবি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৫৮:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪৬ Time View

এফ,এম,এ রাজ্জাক, পাইকগাছা (খুলনা) খুলনার পাইকগাছা উপজেলার নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য। এক সময় যে নদী-নালা ছিল স্বচ্ছ পানিতে ভরা, এখন সেখানে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক, ডিসপোজেবল কাপ-প্লেট এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে মৎস্যসম্পদ, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্য।স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার পাইকগাছা পৌরসভাসহ লতা, দেলুটি, গদাইপুর, রাড়ুলি, সোলাদানা, গড়ইখালী, কপিলমুনি, হরিঢালী, চাঁদখালী ও লস্কর ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজার, খাল, বিল এবং নদীর তীরে প্রতিদিনই অসচেতনভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেন হয়ে নদী ও খালে গিয়ে জমা হচ্ছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে।পাইকগাছার কপোতাক্ষ, শিবসা ও উপজেলার বিভিন্ন শাখা খাল এবং বিলাঞ্চলে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে প্লাস্টিকের স্তূপ। অনেক জেলে মাছ ধরার পর ছিঁড়ে যাওয়া নাইলনের জাল কিংবা প্লাস্টিকের দড়ি নদীতেই ফেলে রাখছেন। এগুলো দীর্ঘদিন পানিতে থেকে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক সহজে পচে না। বছরের পর বছর পানিতে ও মাটিতে থেকে এটি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যচক্রেও পৌঁছে যায়। ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।স্থানীয়দের উদ্বেগপাইকগাছা পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল করিম বলেন,”আগে খালগুলোতে স্বচ্ছ পানি ছিল। এখন বাজারের সব ময়লা এসে খালে পড়ছে। প্লাস্টিক জমে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।”লতা ইউনিয়নের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন,”বাজার করে সবাই পলিথিন এনে পরে যেখানে-সেখানে ফেলে দেয়। মানুষ যদি নিজেরা সচেতন না হয়, তাহলে শুধু প্রশাসনের পক্ষে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।”কপিলমুনি এলাকার জেলে হারুন গাজী বলেন,”নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। অনেক সময় জালে প্লাস্টিক আর পলিথিন বেশি উঠে আসে। ছিঁড়ে যাওয়া জাল অনেকেই নদীতে ফেলে রাখে, এটাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।”গড়ইখালী ইউনিয়নের কলেজ শিক্ষার্থী তানজিলা খাতুন বলেন,”স্কুল-কলেজে পরিবেশ রক্ষার কথা শেখানো হলেও বাস্তবে অনেকেই তা মানেন না। প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং সবাইকে সচেতন করতে হবে।”পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের দাবিপরিবেশ সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। বাজারগুলোতে আলাদা বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, পলিথিনের ব্যবহার কমানো, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি যারা প্রকাশ্যে নদী-খাল বা জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।স্থানীয়দের মতে, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ব্যবসায়ী, জেলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ একযোগে কাজ করলে পাইকগাছার নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়কে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই জনপদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post

জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কি গভীর সংকটে? : মোঃ সাইফুল ইসলাম

error: Content is protected !!

পাইকগাছার নদী-নালা, খাল-বিলে বাড়ছে প্লাস্টিক দূষণ১০ ইউনিয়ন ও পৌরসভাজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা, সচেতনতা ও কঠোর নজরদারির দাবি

Update Time : ০২:৫৮:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

এফ,এম,এ রাজ্জাক, পাইকগাছা (খুলনা) খুলনার পাইকগাছা উপজেলার নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য। এক সময় যে নদী-নালা ছিল স্বচ্ছ পানিতে ভরা, এখন সেখানে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক, ডিসপোজেবল কাপ-প্লেট এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে মৎস্যসম্পদ, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্য।স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার পাইকগাছা পৌরসভাসহ লতা, দেলুটি, গদাইপুর, রাড়ুলি, সোলাদানা, গড়ইখালী, কপিলমুনি, হরিঢালী, চাঁদখালী ও লস্কর ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজার, খাল, বিল এবং নদীর তীরে প্রতিদিনই অসচেতনভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেন হয়ে নদী ও খালে গিয়ে জমা হচ্ছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে।পাইকগাছার কপোতাক্ষ, শিবসা ও উপজেলার বিভিন্ন শাখা খাল এবং বিলাঞ্চলে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে প্লাস্টিকের স্তূপ। অনেক জেলে মাছ ধরার পর ছিঁড়ে যাওয়া নাইলনের জাল কিংবা প্লাস্টিকের দড়ি নদীতেই ফেলে রাখছেন। এগুলো দীর্ঘদিন পানিতে থেকে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক সহজে পচে না। বছরের পর বছর পানিতে ও মাটিতে থেকে এটি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যচক্রেও পৌঁছে যায়। ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।স্থানীয়দের উদ্বেগপাইকগাছা পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল করিম বলেন,”আগে খালগুলোতে স্বচ্ছ পানি ছিল। এখন বাজারের সব ময়লা এসে খালে পড়ছে। প্লাস্টিক জমে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।”লতা ইউনিয়নের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন,”বাজার করে সবাই পলিথিন এনে পরে যেখানে-সেখানে ফেলে দেয়। মানুষ যদি নিজেরা সচেতন না হয়, তাহলে শুধু প্রশাসনের পক্ষে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।”কপিলমুনি এলাকার জেলে হারুন গাজী বলেন,”নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। অনেক সময় জালে প্লাস্টিক আর পলিথিন বেশি উঠে আসে। ছিঁড়ে যাওয়া জাল অনেকেই নদীতে ফেলে রাখে, এটাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।”গড়ইখালী ইউনিয়নের কলেজ শিক্ষার্থী তানজিলা খাতুন বলেন,”স্কুল-কলেজে পরিবেশ রক্ষার কথা শেখানো হলেও বাস্তবে অনেকেই তা মানেন না। প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং সবাইকে সচেতন করতে হবে।”পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের দাবিপরিবেশ সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। বাজারগুলোতে আলাদা বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, পলিথিনের ব্যবহার কমানো, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি যারা প্রকাশ্যে নদী-খাল বা জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।স্থানীয়দের মতে, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ব্যবসায়ী, জেলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ একযোগে কাজ করলে পাইকগাছার নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়কে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই জনপদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।