
স্টাফ রিপোর্টার: “যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।” জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, ভোলা থেকে বদলিজনিত বিদায়ের প্রহরে এমনই আবেগঘন অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মোঃ সবুজ খান। একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বদলি হয়ে যাওয়া চাকরিজীবনের স্বাভাবিক নিয়ম হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান, কিছু মানুষ ও কিছু সময় কখনোই শুধু চাকরির অংশ হয়ে থাকে না; বরং তারা হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী ঠিকানা হয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, ভোলার দায়িত্বে যতদিন ছিলেন, সততা, নিষ্ঠা ও সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন বলে জানান সবুজ খান। তাঁর প্রতিটি কাজের কেন্দ্রে ছিল—“জনগণের জন্য গণগ্রন্থাগারের সেবাকে আরও সহজ, আধুনিক ও জনবান্ধব করা।” নিজের মেধা, শ্রম ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে কাজ করার চেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, একটি ভঙ্গুর ও নানা সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও মডেল প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার যে যাত্রা, তার প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে অত্যন্ত গর্বের, আবার একই সঙ্গে আবেগেরও।
সবুজ খান বলেন, এই পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা এসেছে। তবে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সুযোগ্য মহাপরিচালক, পরিচালক, জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকর্মীবৃন্দ এবং সর্বোপরি তাঁর প্রিয় সহকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসা তাঁকে প্রতিটি বাধা অতিক্রম করার সাহস দিয়েছে। তাঁদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা কখনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
কাজ করতে গিয়ে হয়তো তাঁরও কিছু ভুল ও ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে উল্লেখ করে সবুজ খান বলেন, “আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই, আমরা মানুষ, আর মানুষের পথচলায় ভুল থাকবেই।” বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর ছোট-বড় সব ত্রুটি ও ভুলের দায় তিনি নিজেই গ্রহণ করছেন বলেও জানান। পাশাপাশি তাঁর কাজের যেটুকু সফলতা ও অর্জন, তার প্রতিটি কৃতিত্ব তিনি তাঁর প্রিয় সহকর্মী, অধিদপ্তরের সহযোদ্ধা এবং ভোলার আপামর মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতার প্রতি উৎসর্গ করেন।
তিনি বলেন, “আমি জানি, একটি প্রতিষ্ঠান কখনো একজন মানুষের নয়। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে অনেক মানুষের সম্মিলিত শ্রম, ভালোবাসা ও বিশ্বাসে। আমি শুধু সেই যাত্রার একজন সামান্য সহযাত্রী ছিলাম।”
বিদায়ের এই প্রহরে সবুজ খান বলেন, “আজ চলে যাচ্ছি। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি অসংখ্য স্মৃতি, মানুষের ভালোবাসা, সহকর্মীদের আন্তরিকতা আর ভোলার মাটির প্রতি এক গভীর মায়া। রেখে যাচ্ছি আমার শ্রমের কিছু চিহ্ন, কিছু পরিবর্তনের স্মৃতি, আর অনেক মানুষের মুখে দেখা সেই তৃপ্তির হাসি, যেটিই ছিল আমার কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
সময়ের স্রোতে মানুষ তাঁকে কতদিন মনে রাখবে, তা নিয়েও আবেগঘন প্রশ্ন রাখেন তিনি। বলেন, “জানি না, সময়ের স্রোতে মানুষ আমাকে কতদিন মনে রাখবে। হয়তো একদিন আমার নামটিও অনেকের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। কিন্তু আমার একটি ছোট্ট প্রশ্ন থেকেই যাবে—‘ভোলার মানুষ আমাকে মনে রাখবে তো?’”
গণগ্রন্থাগারের পাঠকদের স্মৃতিতে নিজের কর্মযাত্রা বেঁচে থাকলেই সেটিকে সার্থকতা হিসেবে দেখছেন সবুজ খান। তিনি বলেন, “যদি কোনো একদিন এই গণগ্রন্থাগারের কোনো পাঠক বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে করেন, ‘এই জায়গাটাকে একদিন কেউ খুব আপন করে গড়ে তুলতে চেয়েছিল…’ তাহলেই আমার এই পথচলা সার্থক।”
ভোলার প্রতি নিজের গভীর মায়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ভোলা, তোমার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু তোমাকে হৃদয় থেকে বিদায় দিতে পারছি না। চাকরির বদলি আমাকে দূরে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভোলার মানুষের ভালোবাসা থেকে আমাকে কখনোই বদলি করতে পারবে না।”
বিদায়বেলায় সবুজ খানের কণ্ঠে যেন ভেসে ওঠে এক গভীর আবেগ “বিদায়, প্রিয় জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, ভোলা। বিদায়, প্রিয় সহকর্মীরা। বিদায়, আমার প্রিয় ভোলাবাসী।”
সবশেষে তিনি বলেন, “এ বিদায় কোনো শেষ নয়, এ শুধু ঠিকানা বদলের গল্প। স্মৃতিতে, ভালোবাসায় আর হৃদয়ের এক কোণে ভোলা চিরকালই থেকে যাবে। বিদায় ভোলা।”
Reporter Name 









