
সকালের শঙ্কা যে বাস্তবতার দিকেই এগোচ্ছে, দিনের শেষে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার নিয়ে সাম্প্রতিক যৌথ বৈঠকের পর প্রকাশিত বিবৃতি নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বিশেষ করে “ক্রেডিবল রিক্রুটিং এজেন্সি” এবং “জিরো কস্ট” নিয়োগ ব্যবস্থার মতো শব্দচয়নগুলোকে ঘিরে।
প্রথমত, “ক্রেডিবল রিক্রুটিং এজেন্সি” কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী? কে নির্ধারণ করবে কোন এজেন্সি বিশ্বাসযোগ্য? অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের অস্পষ্ট শব্দবন্ধ প্রায়ই একটি সীমিত গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি করে। অতীতে আমরা দেখেছি, মাত্র ১০-১২টি এজেন্সির হাতে পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল—যার ফলে প্রতিযোগিতা কমে, স্বচ্ছতা হারিয়ে যায় এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হন সাধারণ শ্রমপ্রত্যাশীরা। নতুন বিবৃতির ভাষা সেই পুরোনো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
দ্বিতীয়ত, “জিরো কস্ট” বা বিনা খরচে কর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবতা কি এত সহজ? অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের বলে, এই প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। বরং নানা অপ্রকাশিত খরচ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে শ্রমিকদেরই শেষ পর্যন্ত চড়া মূল্য গুনতে হয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে—এইবার কি সত্যিই ভিন্ন কিছু হবে, নাকি এটি কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিই থেকে যাবে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পূর্ববর্তী সময়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি যদি বাস্তবে ঘটে, তাহলে তা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে এবং ভবিষ্যতে অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াইকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে একটি স্পষ্ট বার্তা যায় অতীতের অন্যায়ের জবাবদিহি ছাড়াই নতুনভাবে একই প্রক্রিয়া চালু হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল দ্বৈততার ইঙ্গিত দেয়। একদিকে রয়েছে নতুন করে শ্রমবাজার চালুর সম্ভাবনা, যা হাজারো শ্রমপ্রত্যাশীর জন্য আশার আলো হতে পারে। অন্যদিকে, রয়েছে পুরোনো সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছতা এবং অসমতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। যদি “ক্রেডিবল এজেন্সি” নির্বাচনের প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষ না হয়, এবং “জিরো কস্ট” বাস্তবায়নের কার্যকর তদারকি না থাকে, তাহলে এই উদ্যোগও আগের মতোই বিতর্কের জন্ম দেবে।
অতএব, এটি কেবল একটি চুক্তি বা বিবৃতির বিষয় নয় এটি লাখো মানুষের জীবিকা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। কারণ, এই বাস্তবতা বোঝার জন্য সত্যিই “রকেট সায়েন্স” লাগে না লাগে শুধু অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা।
সম্পাদকীয় : লেখক -মোস্তফা কামাল খান
Reporter Name 


















