বাংলাদেশ ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবনানন্দ দাশ এর “বনলতা সেন” কবিতার অন্তর বয়ান:  নিরঞ্জন রায়, কবি ও প্রাবন্ধিক দিনাজপুর। 

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:১৩:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৯৮ Time View

বনলতা সেন/ জীবনানন্দ দাশ 

 

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর

হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’১

 

 

সৃষ্টিকর্ম অনেক সময় তার স্রষ্টাকেও ছাড়িয়ে যায়, যখন তা ছাড়িয়ে যায় তা পায় সর্বকালের, সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বশ্রেষ্ঠের মর্যাদা। উইলিয়াম সেক্সপিয়র একজন প্রখ্যাত নাট্যকার আমরা সবাই তা জানি, সেক্সপিয়র হ্যামলেট নাটক লিখেছেন এটাও আমাদের অজানা নয়। হ্যামলেট নাটকের প্রিন্স হ্যামলেটকে নিয়ে যতখানি চর্চা, মাখামাখি, মাতামাতি, আলোচনা, সমালোচনা, মনোবিশ্লেষণ তা যেন হ্যামলেট নাটকের স্রষ্টা উইলিয়াম শেকসপিয়রকেও ছাড়িয়ে যায়। আজ প্রিন্স হ্যামলেট একটি মিথিক্যাল ক্যারেকটার (mythical character); সর্বকালের চর্চা ও অনুশীলনযোগ্য একটি রহস্য চরিত্র। অমর সৃষ্টিকর্ম মোনালিসা যেমন করে ছাড়িয়ে গেছে লিওনার্ড দ্য ভিঞ্চিকে, হেলেন মিথ যেমন করে ছাড়িয়ে গেছে তার স্রষ্টা হোমারকে।

জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিও ঠিক তেমনি। বনলতা সেন কবিতাটি আজ বহুল আলোচিত ও চর্চিত এবং এই কবিতার জনপ্রিয়তার গ্রাফ যথারীতি উর্ধমুখী। আজ এ কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র বনলতা সেন নাম্মী মেয়েটি একটি মিথিক্যাল ক্যারেকটার (mythical character) যা জীবনানন্দ দাশের জনপ্রিয়তাকেও ম্লান করে দেয়। বনলতা সেনকে নিয়ে আজ পাঠকের আগ্রহের শেষ নেই—বনলতা সেন কি বাস্তবের কোনো নারী, নাকি কবির কল্পজগতের রহস্য সৃষ্টি! বাস্তবতা এটাই, কোনো পাঠক বা গবেষকই ঠিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছেন না বনলতা সেন আদতে  নাটোরের কোনো নারী কিনা, নাকি বাস্তবতা ও কবি কল্পনার মিশেলে এক অনন্য সৃষ্টি, সর্বকালের সব শ্রেণির পাঠকের জন্য সমান আগ্রহের এবং নিরন্তর গবেষণার বিষয়।

 

 

‘বনলতা সেন’ কবিতাটি প্রকাশেরও একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এই কবিতাটি প্রথম আলোর মুখ দেখে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার হাত ধরে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ, পৌষসংখ্যা ১৩৪২। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ নামে কাব্যগ্রন্থ বের হলে তাতে বনলতা সেন কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। পরের ইতিহাস আরো চমকপ্রদ। বুদ্ধদেব বসু প্রতিষ্ঠিত কবিতাভবন এর ‘এক পয়সায় একটি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয় কবিতাটি, যার সম্পাদনা করেন কবি স্বয়ং এবং যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ কবির ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে তাতেও বনলতা সেন কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে সিগনেট প্রেস থেকে ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ বের হলে তাতেও বনলতা সেন কবিতাটি যথারীতি প্রথম কবিতা হিসেবে জায়গা করে নেয়।

 

বনলতা সেন কবিতার বনলতা সেন চরিত্রটি বহুমাত্রিকতা পায়। একেক গবেষক একেক দৃষ্টিকোণ থেকে বনলতা সেন চরিত্রটিকে তুলে আনবার চেষ্টা করেন। ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ গ্রন্থে “লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের অর্থনীতি” শিরোনামে এক প্রবন্ধে বনলতা সেনকে বিনোদবালা বলে চিহ্নিত করে আকবর আলি খান হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। তাঁর মতে, রূপোপজীবীদের একটি বড় কেন্দ্র ছিল নাটোরে এবং সেখানকার বারবিলাসিনীরাই উত্তরবঙ্গের বড় বড় জমিদারদের মনোরঞ্জন করতেন, তাঁদের দু দণ্ডের জন্যে হলেও শান্তি দিতেন। তাঁর দাবি, বনলতা সেনও তেমনি একজন নারী যে কিনা ক্লান্ত প্রাণ সংবেদনশীল কবিকে ‘দু’দণ্ডের শান্তি’ দিয়েছিল, ‘নিশীথের অন্ধকারে’ এবং ‘দূর দূরান্তরে’।

তিনি আরো বলছেন, “বনলতা সেন পরিচয় কবিতাটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন দ্যোতনা দেয়। কেন আমরা বুঝতে পারি, বনলতা সেন কেন কবিকে ‘দু’দণ্ডের শান্তি’ দিয়েছিল, বুঝতে পারি কেন কবির অভিসার ‘নিশীথের অন্ধকারে’ এবং ‘দূর দূরান্তরে’। এ পটভূমিতে দেখতে গেলে, এতদিন কোথায় ছিলেন’ একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। বনলতা সেন যেন বলতে চাচ্ছে যে, সে ইচ্ছা করে রূপজীবার বৃত্তি গ্রহণ করে নি, তার জীবনে অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা গেছে, সে দুঃসময়ে তার পাশে কেউ ছিল না। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’ একটি সৌজন্যমূলক প্রশ্ন নয়, এ হচ্ছে বিপর্যস্ত নারীত্বের আর্তনাদ। বনলতার পরিচয় পেলেই আমরা বুঝতে পারি কবি কেন কবিতার শেষে বলেছেন ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’। বনলতাদের সাথে দু’দণ্ড সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দদের (বিবাহিত পুরুষদের) লাবণ্যপ্রভাদের (স্ত্রীদের) কাছে ফিরে আসতে হয়। বনলতাকে আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীতে প্রকাশ্যে পাওয়ার সুযোগ নেই। বনলতার কথা কাউকে বলারও উপায় নেই। বনলতাকে নীরবে নিভৃতে স্মরণ করতে হয় অপরাধবোধ নিয়ে। তাই কবি বলেছেন, ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এ অন্ধকার প্রাকৃতিক নয়, এ অন্ধকার মানসিক। আমার জানামতে নিষিদ্ধ প্রেমের আনন্দ ও বেদনা এত সুন্দরভাবে আর কোন কবি ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।২”

 

জীবনানন্দ গবেষক অধ্যাপক আবু তাহের মজুমদার অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন তাঁর আলোচনা গ্রন্থ ‘জীবনানন্দ’৩ এর বনলতা সেন শিরোনামের প্রবন্ধে। তাঁর মতে, বনলতা সেন আসলে বরিশালের এক ভদ্র ঘরের মেয়ে। তিনি দাবি করেন,  জীবনানন্দের  ‘কারুবাসনা’ উপন্যাসে তেমন বর্ণনার ইঙ্গিত তিনি পেয়েছেন। বনলতা ছিলেন জীবনানন্দের পাশের বাড়ির একজন নারী।

 

জীবনানন্দ দাশের কারুবাসনা উপন্যাসে বনলতা সেন সম্পর্কে আমরা যা জানতে পারি–

 

‘কিশোরবেলায় যে মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোনো এক বসন্তের ভোরে বিশ বছর আগে সুর ও যৌবনে উত্তরআকাশে দিগঙ্গনা সেজে এসেছে। দক্ষিণ আকাশে সে-ই বিগত জীবনের কৃষ্ণা মণি, পুব আকাশ ঘিরে তারই নিটোল কালো মুখ। নক্ষত্রমাখা রাত্রির কালো দিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার। —প্রিয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী চমরীর মতো অপরূপ রূপ। মিষ্টি ক্লান্ত অশ্রু-মাধ্য চোখ, নগ্ন শীতল নিরাবরণ দুখানা হাত, ম্লান ঠোঁট, পৃথিবীর নবীন জীবন ও নবলোকের হাতে প্রেমে, বিচ্ছেদ ও বেদনার সেই পুরোনো পল্লির দিনগুলো সমর্পণ করে কোন দূর নিঃস্বাদ নিঃসূর্য অভিমানহীন মৃত্যুর উদ্দেশে তার যাত্রা । / সেই বনলতা— আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে । কুড়ি – বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে : বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল । দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললে সে। তারপর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকেই আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তারপর খিড়কির পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে । নিবিড় জামরুল গাছটার নিচে একবার দাঁড়াল , তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল ।/ তারপর তাকে আর আমি দেখিনি । / অনেক দিন পরে আজ আবার সে এল ; মনপবনের নৌকায় চড়ে , নীলাম্বরী শাড়ি পরে , চিকন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে আবার সে এসে দাঁড়িয়েছে ; মিষ্টি অশ্ৰু – মাখা চোখ , ঠাণ্ডা নির্জন দুখানা হাত , ম্লান ঠোঁট , শাড়ির ম্লানিমা । সময় থেকে সময়ান্তর , নিরবচ্ছিন্ন , হায় প্রকৃতি , অন্ধকারে তার যাত্রা— ।৪

 

 

বিশিষ্ট জীবনানন্দ গবেষক এবং জীবনানন্দের সাহচর্যে আসা অশোক মিত্র এক নতুন তথ্য নিয়ে হাজির হন। তিনি বলেন,

‘এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এল, সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, না কি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের জবার পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছিলেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন, সে-সমস্ত খবর বেরোত। হয়তো ১৯৩২ সাল হবে, নয়তো পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহী থেকে নাটোর তো একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহোত্তর পর্বে অন্য পদবি ব্যবহার করতেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কি না। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়।”৫

 

 

 

জীবনানন্দ দাশ এর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি “বনলতা সেন” কবিতা দিয়েই শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর লেখা তাঁর এ কবিতা, যখন মৃত্য ও ধ্বংশযজ্ঞ ক্রিয়াশীল নানাভাবে কবিমনে। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বহুল চর্চিত অভিযোগ, তিনি নির্জনতার কবি, নিঃসঙ্গতার কবি, নির্জন রাস্তায় চলা আত্মনিমগ্ন একান্ত কবি যুবরাজ, মৃত্যু চেতনাবোধে আচ্ছন্ন মানুষ। প্রকৃতির কবি। বাংলার নদী, মাঠ, প্রান্তর, অরণ্য, পাখপাখালি, সবুজ শষ্যখেত, আকাশ, নক্ষত্ররাজি তাঁর মানস দর্পণে তিলোত্তমা এক নগরী।

 

‘বনলতা সেন’ স্থূল বিচারে একটি নিছক প্রেমের কবিতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সঞ্জাত একটি প্রেমের কবিতা, যে কবিতার রহস্য চরিত্র এক নারী যখন কবি বলেন— “আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন”।

আমার বিচারে, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিকে যদি একটি নিরেট প্রেমের কবিতা হিসেবেও ধরা হয় তাহলেও এটি একটি পরাবাস্তব (surrealism) গোত্রের প্রেমের কবিতা এবং কবিতার ‘বনলতা সেন’ মেয়েটি একটি নিরপেক্ষ সত্তা, বনলতা সেন কবির একার না, সকলের আরাধ্যা, দিনশেষে সকল মানুষের একমাত্র , এবং অবশ্যম্ভাবী ঠিকানা।

 

 

বনলতা সেন কবিতাটি যেন এক সুদূরের সুরলহরী, বেলা শেষে পথ হারানো পথিকের আবার সেই পথে ফিরে আসা, তাঁর মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করা। সে ক্লান্ত পথশ্রান্ত। মহাকালের পথ ধরে যেন সে নিরন্তর চলমান। সুদীর্ঘ ক্লান্তিকর পথ পরিক্রমা  শেষে সে খুঁজে পায় শান্তির এক নীড়–এক মোহনীয় রমণীর –, বনলতা যার নাম, নাটোরের বনলতা সেন!

কবি যেমনটি বলেছেন,

‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতি দূর সমুদ্রের পর

হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’

 

কবি বনলতা সেনকে আশ্রয় হিসেবে খুঁজে পেয়ে মন্ত্রমুগ্ধ, তৃপ্ত, প্রাণিত। কুহক ছড়িয়েছে বনলতার চুল, তার মুখ। পাখির নীড়ের মতো চোখ তাঁকে নতুন করে মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছে, অভিমানের সুরে বনলতা যখন জিজ্ঞেস করে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

 

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর যাপিত জীবনের আখ্যানের যবনিকা টানেন এক দার্শনিক ভাবনায়। তিনি বলেন,

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে–সব নদী–ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

 

একজন মানুষের যাপিত জীবনের উদয় অস্ত আছে, সূর্যোদয় সূর্যাস্ত আছে, দিন শেষে আসে সন্ধ্যা, ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল, তার মানে বর্ণিল জীবনের গল্পকথার শেষ হয়, তখন আয়োজন চলে অভিজ্ঞতার ঝুড়ি মেলে ধরা, গল্প লেখার পালা পাখিদের নীড়ে ফেরা নিয়ে, এ যেন সমস্ত প্রতীক্ষার অবসান, বনলতার কোলে নিজেকে সঁপে দেয়া।

Edgar Allan Poe এর কবিতা ‘To Helen’ দ্বারা জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন” কবিতাটি প্রভাবিত বলে অনেকে অভিযোগ করেন । এখানে পাঠকের সুবিধার জন্য বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ এর ‘শুদ্ধতম কবি ‘ গ্রন্থ থেকে Edgar Allan Poe এর কবিতা To Helen এবং হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী-কৃত অনুবাদ যথাক্রমে তুলে ধরা হলো:

 

‘Helen, thy beauty is to me

Like those Nicéan barks of yore,

 

That gently, o’er a perfumed sea,

The weary, way-worn wanderer bore

To his own native shore.

 

On desperate seas long wont to roam,

Thy hyacinth hair, thy classic face,

Thy Naiad airs have brought me home

To the glory that was Greece,

And the grandeur that was Rome.

 

 

Lo! in yon brilliant window-niche

How statue-like I see thee stand,

The agate lamp within thy hand!

Ah, Psyche, from the regions which

Are Holy-Land!’

 

এই কবিতার হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী-কৃত রূপান্তর:

‘হেলেন , তোমার মুখ নিসিয়ার জাহাজের মতো

পাড়ি দিত গন্ধময় একখানি সমুদ্রের বুকে , ঘরহারা নাবিকের পরিচিত তীরে পৌছে দিত, নিরাপদ নীড়ে তার, জন্মভূমি,উত্তরিত শোকে,

পুরাকালে লক্ষ্যভেদী আমোঘ যাত্রার সুখে – দুখে ।

বেপরোয়া উয়ে – ঢেউয়ে ঢের ঘুরে ক্লান্ত বহুদিন

তোমার ধ্রুপদী মুখ , ভেসে-আসা হায়াসিন্থ চুল,

হে নায়াড়, তোমার লীলা, হে অপ্সরী বিলীন জলের বিভঙ্গে, – তুমি উন্মোচিত করো মর্মমূলে

রোমের ঐশ্বর্য আর গ্রীসের মহিমা প্রাচীন।

দেখো, শুধু চেয়ে থাকি , অপলক, অদূরবর্তিনী

গবাক্ষে আশ্রিত তুমি , সন্নিকট নিঃশব্দ মূরতি মূৰ্চ্ছাহত, মায়াবিনী, যেন থেমে আছে তার গতি,

হাতখানি ধরে আছে ধাতুর প্রদীপ। বলতে নেই ,

আ, তুমি সাইকী , তুমি তীর্থভূমি হতে আনা রতি।’৬

 

জীবনানন্দ দাশের কবিতা ‘বনলতা সেন’ পাঠে আমার তা মনে হয়নি, বরং এটা বলা যৌক্তিক ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির সাথে Edgar Alan Poe এর To Helen কবিতার যতটুকু সাযুজ্য তা কাকতালীয়; বনলতা সেন কবিতার ব্যাপ্তি, রূপকল্প ও চিত্রময়তা বহুগুণে বেশি এবং তা জীবনানন্দিয়, দেশজ রূপকল্প, চিত্রকল্প, শব্দচয়ন, বিন্যাস ও বিষয় বৈচিত্রে অনন্য। আসলে ‘বনলতা সেন’ একটি রূপকাশ্রয়ী পরাবাস্তব প্রেমের কবিতা। এখানে ‘বনলতা সেন’ একটি রূপক নারী চরিত্র, (তবে বস্তুতপক্ষে একটা নিরপেক্ষ সত্তা)—-মৃত্যুর কুহকজাল বিস্তারকারী কুহকিনী। আর জীবনানন্দ দাশ মহাকালের কবি, এক অর্থে মানব সভ্যতার প্রতিনিধি, মহাকালের ধারক ও বাহক, যিনি পুনঃপুন জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে গেছেন মহাকালের সমস্ত ঘটনাবলিকে নিজের ভেতর ধারণ করে। “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।”

 

কবি ও গবেষক মাসুদুল হক তাঁর গবেষণাগ্রন্থ “জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য” এর ” ‘বনলতা সেন’: কবিতার অন্বয় ও সাঙ্গীতিক নন্দনতত্ত্ব” প্রবন্ধে  যেমনটা বলেছেন,

“প্রেমেন্দ্র মিত্রই প্রথম জানিয়েছিলেন ‘ বনলতা সেন ‘ কবিতায় অ্যালেন পো রচিত ‘ To Helen ’ কবিতাটির সাদৃশ্য বিদ্যমান । তবে সাদৃশ্যের বেড়াজাল অতিক্রম করে কবিতাটি আমাদের পাঠক – হৃদয়ে একটি মিথ হিসেবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । মিথ বলতে আমরা বুঝি : “ বাস্তব ও স্বপ্নের সেতুবন্ধ , মানুষ যা হতে চেয়েছে তারই আদর্শ , যা সে প্রকাশ করতে চেয়েছে তারই মূর্তায়ন । ” আর এই ক্ষেত্রে আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে , ‘ বনলতা সেন ‘ কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের ‘ ব্যক্তিগত মিথ ‘ , যা সার্বজনীন মিথে পরিণত হয়েছে । কবিতার মানসচর্যা ব্যক্তিগতকে সমষ্টিগত অধি আয়তনিক পরিসরে ; আত্মাকে নৈরাত্মে , অভিজ্ঞতাকে বহুনন্দিত সারাংশে , দ্যোতককে অবিশ্রাম দ্যোতনায় স্পন্দিত এবং বিলম্বনে ; অত্যুচ্চ কল্পনাকে ব্যবহারিকে নিয়ে আসে । আর এভাবে বিষয় ও বিষয় – সত্তার পারম্পর্য , দৃশ্যকল্পে – উপমায় – বাকপ্রতিমায় মরমের দুয়ার খুলে জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘ বনলতা সেন ’ কবিতাকে উপস্থাপন করেছেন ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যক্তিক যাদুবৃত্তে ( magic circle )।’৭

 

কবিতাটির প্রথম স্তবকে হাজার বছর ব্যাপী পথাচলা ক্লান্তিকর এক পথিকের ভ্রমণের কথা বলা হয়েছে। আসলে একজন একক ব্যক্তির পক্ষে হাজার বছর ধরে পথচলা একটি অলীক কল্পনা। এখানে প্রকৃতপক্ষে মানব সভ্যতার পথ পরিক্রমার কথাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। তাঁর পুনঃপুন জন্ম এবং মৃত্যু হয়েছে, মানব সভ্যতার বয়সী একজন মানুষের পক্ষে সেটা খুব সম্ভব। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ক্ষণকাল বিরতির পর আবারও জন্ম এবং পথ পরিক্রমা শুরু। তিনি হাজার বছর (এখানে হাজার বছর অনির্দিষ্টকাল অর্থে) ধরে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে ফিরেছেন;- সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর অবধি যার পরিব্যাপ্তি। বিম্বিসার আশোকের জগতে তাঁর উপস্থিতি, বিম্বিসারের করুণ মৃত্যু, এবং আশোকের অনুতাপ, এখন সেসব ধূসর ধুলোমলিন স্মৃতি। তিনি দূরবর্তী নগরী বিদর্ভেও গেছেন, অর্থাৎ মহাকালের সমস্ত ঘটনাবলির ভেতর তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। চারিদিকে দেখেছেন জীবন সমুদ্রের কর্মচাঞ্চল্য, আবার সফেন হয়ে সমুদ্রেই মিলিয়ে যাওয়া, জীবনের পৌনঃপুনিকতা। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা জীবন মৃত্যুর ভেতর দিয়ে কবিকে ক্লান্ত করে তুলেছে, জীবনের চিন্তা ও কর্মযজ্ঞের ভারে তিনি অবসাদগ্রস্ত। এই ক্লান্তিকর অস্তিত্বের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য শান্তির ঝলক নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল মৃত্য (মৃত্যুতে মানুষের অবসাদ, চিন্তা ও কর্মযজ্ঞের ভার দূর হয়)— বনলতা সেন, মোহনীয় নারী, তার আলিঙ্গন, তার সোহাগ , পাখির নীড়ের মাদকতা।(এখানে নাটরের বনলতা সেন একটি রূপক, এই রূপকের মধ্য দিয়ে তিনি  বাংলার নারীদের পতিপ্রেমের দিকটিও তুলে ধরেছেন)। আরো বলা যায়, হিন্দু ধর্মের জন্মান্তরবাদ, পুনঃপুন জন্ম ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং নির্বাণ লাভের মধ্য  আত্মিক মহামুক্তি এবং বৌদ্ধ দর্শন অনুসারে  মোক্ষলাভ মৃত্যুর প্রতীকী চরিত্র বনলতা সেনকে প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে।

কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে কবি বনলতা সেনের আশ্চর্য নান্দনিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন বাস্তব ও পরাবাস্তব ভাবনার সমন্বয় ঘটিয়ে—— “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’ পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” বনলতা সেনের চুলের রং যেন দূর আদিম অন্ধকার নগরী বিদিশার( বিদিশা একটি পাপ পূণ্যে নিমজ্জিত নগরী) মতো, এমন রং আসলে মৃত্যরূপী রমণীর এবং মুখ যেন পরিত্যক্ত নগরী শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মতো ভুতুড়ে, ভেতরে গহীন অন্ধকার। প্রাণসংকটে নিমজ্জিত জাহাজঢুবি নাবিকের সবুজ তৃণভূমির দ্বীপ দারুচিনি দেখে যেমন আশান্বিত হন, বাঁচার আশায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, ঠিক তেমনি যেন কবি বনলতা সেনকে অন্ধকারে আবিষ্কার করেছেন, আবিষ্কার করেছেন অন্ধকারের রাণী মৃত্যুকে। মৃত্যরূপী বনলতার সবিনয় জিজ্ঞাসা, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ জীবনকে ভালোবাসে এই যে হাজার বছর ধরে জীবন সমুদ্রে তোমার পরিভ্রমণ, চষে বেড়ালে ভূগোলের নানা প্রান্তে, ইতিহাস চর্চা করলে, কিন্তু কী পেলে? দিনশেষে তো আমার কাছেই ফিরে আসতে হচ্ছে তোমাকে! মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে—মোহনীয় রমণী বনলতা( মৃত্যুর আর এক নাম) সেনকেই। আসলে, মৃত্য কাউকেই ফেরায় না, নির্বিশেষে সবাইকে পাখির নীড়ের মমতা, পাখির নীড়ের চোখ দিয়ে আগলে রাখে।

 

তৃতীয় স্তবকে দেখা যায় দিনশেষে কবি জীবনের হিসেব মেলাতে বসে যান—— “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” রূপকল্প ও চিত্রময়তার ভেতর দিয়ে তিনি এই স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে চান যে, জীবনের সবকিছুই একদিন ফুরিয়ে যায়, হেমন্তের শিশিরের মতো ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে, আকাশচারী চিল জীবনের সোনালি অধ্যায় শেষে ঘরে ফিরে আসে, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পৃথিবী স্থবির হয়ে আসে, তখন জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত ধূসর পাণ্ডুলিপি শেষ সম্বল হয়ে যায়, টিপটিপে জোনালির আলোয় তখন অভিজ্ঞতা চর্বনের শেষ সময়, জীবনের সব দায় পরিশোধ করে—– “সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;” এবং সামনে তখন অনিবার্য মৃত্যুই অবশিষ্ট থাকে এবং শেষ ভরসা তখন মৃত্যরূপী মোহনীয় প্রেমিকা রমণী বনলতা সেন, যে সবাইকে আপন মমতা দিয়ে বুকে টেনে নেয়।

 

সর্বোপরি এ কথাও বলা যায়, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি একটি দেশপ্রেম ভিত্তিক কবিতাও বটে। বাংলার রূপ-সৌন্দর্য তাঁকে মোহিত করে, তিনি পুনঃপুন বাংলায় জন্মগ্রহণ করতে চান, তাকে ভালোবেসে মরতে চান। প্রাচীন বাংলার এক সময়ের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পীঠস্থান নাটোরকে তিনি প্রতীকী অর্থে বাংলা হিসেবে বেছে নেন এবং সেখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করতে চান এবং রূপক অর্থে নাটোরের বনলতা সেনকে তিনি  তাঁর প্রেমিকা হিসেবে আশ্রয় করে শান্তি খুঁজে পেতে চান। তিনি বহু দেশ, জনপদ ঘুরে বেড়িয়েছেন, সাগর মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন, বিম্বিশার অশোকের ধূসর জগতে, বিদর্ভ নগরে বিচরণ করেছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি বলতে যা বুঝায় তা তিনি পাননি, পরিশেষে সংবেদনশীল কবির ক্লান্তি নিবারণ করেছে তাঁর জন্মস্থান বাংলা, প্রতীকী নাটোর, প্রতীকী নারী বনলতা সেন, তাঁকে মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছে।

 

তথ্যপঞ্জি:

 

১. জীবনানন্দ দাশ, বনলতা সেন, প্রকাশক-নন্দিনী গুপ্ত, ২৫/৪, কবি মহঃ ইকবাল রোড, কলকাতা ২৩

 

২. আকবর আলি খান, পরার্থপরতার অর্থনীতি,  দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেড ক্রিসেন্ট হাউস, ৬১, মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ ২০০০।

 

৩. আবু তাহের মজুমদার, জীবনানন্দ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেড ক্রিসেন্ট বিল্ডিং ১১৪, মতিঝিল সি. এ–,ঢাকা-১০০০,বাংলাদেশ, ২০০২।

 

৪. জীবনানন্দ দাশ, কারুবাসনা, জীবনানন্দ সমগ্র (তৃতীয় খন্ড): দেবেশ রায় সম্পাদিত। প্রতিক্ষণ, কলকাতা, ১৯৮৬ পৃ: নং -১৯৭

 

৫. অশোক মিত্র, আপিলা-চাপিলা, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।

 

৬. আবদুল মান্নান সৈয়দ, শুদ্ধতম কবি, প্রকাশক- সহিদুল ইসলাম বিজু , তৃতীয় পাঠক সমাবেশ সংস্করণ: জানুয়ারি ২০১১

পৃ ১৪৫-১৪৬

 

৭. মাসুদুল হক, জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, কম্পিউটার কমপ্লেক্স মার্কেট, ৩৮/৩ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০, প্রথম প্রকাশ, একুশে বইমেলা ২০১১, পৃ ৫০

———–

 

নিরঞ্জন রায়

কবি ও প্রাবন্ধিক

অধ্যাপনা, ইংরেজি সাহিত্য

পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ, ঠাকুরগাঁও

মোবাইল নং: 01710869030

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

জীবনানন্দ দাশ এর “বনলতা সেন” কবিতার অন্তর বয়ান:  নিরঞ্জন রায়, কবি ও প্রাবন্ধিক দিনাজপুর। 

Update Time : ১১:১৩:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

বনলতা সেন/ জীবনানন্দ দাশ 

 

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর

হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’১

 

 

সৃষ্টিকর্ম অনেক সময় তার স্রষ্টাকেও ছাড়িয়ে যায়, যখন তা ছাড়িয়ে যায় তা পায় সর্বকালের, সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বশ্রেষ্ঠের মর্যাদা। উইলিয়াম সেক্সপিয়র একজন প্রখ্যাত নাট্যকার আমরা সবাই তা জানি, সেক্সপিয়র হ্যামলেট নাটক লিখেছেন এটাও আমাদের অজানা নয়। হ্যামলেট নাটকের প্রিন্স হ্যামলেটকে নিয়ে যতখানি চর্চা, মাখামাখি, মাতামাতি, আলোচনা, সমালোচনা, মনোবিশ্লেষণ তা যেন হ্যামলেট নাটকের স্রষ্টা উইলিয়াম শেকসপিয়রকেও ছাড়িয়ে যায়। আজ প্রিন্স হ্যামলেট একটি মিথিক্যাল ক্যারেকটার (mythical character); সর্বকালের চর্চা ও অনুশীলনযোগ্য একটি রহস্য চরিত্র। অমর সৃষ্টিকর্ম মোনালিসা যেমন করে ছাড়িয়ে গেছে লিওনার্ড দ্য ভিঞ্চিকে, হেলেন মিথ যেমন করে ছাড়িয়ে গেছে তার স্রষ্টা হোমারকে।

জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিও ঠিক তেমনি। বনলতা সেন কবিতাটি আজ বহুল আলোচিত ও চর্চিত এবং এই কবিতার জনপ্রিয়তার গ্রাফ যথারীতি উর্ধমুখী। আজ এ কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র বনলতা সেন নাম্মী মেয়েটি একটি মিথিক্যাল ক্যারেকটার (mythical character) যা জীবনানন্দ দাশের জনপ্রিয়তাকেও ম্লান করে দেয়। বনলতা সেনকে নিয়ে আজ পাঠকের আগ্রহের শেষ নেই—বনলতা সেন কি বাস্তবের কোনো নারী, নাকি কবির কল্পজগতের রহস্য সৃষ্টি! বাস্তবতা এটাই, কোনো পাঠক বা গবেষকই ঠিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছেন না বনলতা সেন আদতে  নাটোরের কোনো নারী কিনা, নাকি বাস্তবতা ও কবি কল্পনার মিশেলে এক অনন্য সৃষ্টি, সর্বকালের সব শ্রেণির পাঠকের জন্য সমান আগ্রহের এবং নিরন্তর গবেষণার বিষয়।

 

 

‘বনলতা সেন’ কবিতাটি প্রকাশেরও একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এই কবিতাটি প্রথম আলোর মুখ দেখে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার হাত ধরে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ, পৌষসংখ্যা ১৩৪২। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ নামে কাব্যগ্রন্থ বের হলে তাতে বনলতা সেন কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। পরের ইতিহাস আরো চমকপ্রদ। বুদ্ধদেব বসু প্রতিষ্ঠিত কবিতাভবন এর ‘এক পয়সায় একটি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয় কবিতাটি, যার সম্পাদনা করেন কবি স্বয়ং এবং যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ কবির ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে তাতেও বনলতা সেন কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে সিগনেট প্রেস থেকে ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ বের হলে তাতেও বনলতা সেন কবিতাটি যথারীতি প্রথম কবিতা হিসেবে জায়গা করে নেয়।

 

বনলতা সেন কবিতার বনলতা সেন চরিত্রটি বহুমাত্রিকতা পায়। একেক গবেষক একেক দৃষ্টিকোণ থেকে বনলতা সেন চরিত্রটিকে তুলে আনবার চেষ্টা করেন। ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ গ্রন্থে “লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের অর্থনীতি” শিরোনামে এক প্রবন্ধে বনলতা সেনকে বিনোদবালা বলে চিহ্নিত করে আকবর আলি খান হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। তাঁর মতে, রূপোপজীবীদের একটি বড় কেন্দ্র ছিল নাটোরে এবং সেখানকার বারবিলাসিনীরাই উত্তরবঙ্গের বড় বড় জমিদারদের মনোরঞ্জন করতেন, তাঁদের দু দণ্ডের জন্যে হলেও শান্তি দিতেন। তাঁর দাবি, বনলতা সেনও তেমনি একজন নারী যে কিনা ক্লান্ত প্রাণ সংবেদনশীল কবিকে ‘দু’দণ্ডের শান্তি’ দিয়েছিল, ‘নিশীথের অন্ধকারে’ এবং ‘দূর দূরান্তরে’।

তিনি আরো বলছেন, “বনলতা সেন পরিচয় কবিতাটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন দ্যোতনা দেয়। কেন আমরা বুঝতে পারি, বনলতা সেন কেন কবিকে ‘দু’দণ্ডের শান্তি’ দিয়েছিল, বুঝতে পারি কেন কবির অভিসার ‘নিশীথের অন্ধকারে’ এবং ‘দূর দূরান্তরে’। এ পটভূমিতে দেখতে গেলে, এতদিন কোথায় ছিলেন’ একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। বনলতা সেন যেন বলতে চাচ্ছে যে, সে ইচ্ছা করে রূপজীবার বৃত্তি গ্রহণ করে নি, তার জীবনে অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা গেছে, সে দুঃসময়ে তার পাশে কেউ ছিল না। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’ একটি সৌজন্যমূলক প্রশ্ন নয়, এ হচ্ছে বিপর্যস্ত নারীত্বের আর্তনাদ। বনলতার পরিচয় পেলেই আমরা বুঝতে পারি কবি কেন কবিতার শেষে বলেছেন ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’। বনলতাদের সাথে দু’দণ্ড সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দদের (বিবাহিত পুরুষদের) লাবণ্যপ্রভাদের (স্ত্রীদের) কাছে ফিরে আসতে হয়। বনলতাকে আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীতে প্রকাশ্যে পাওয়ার সুযোগ নেই। বনলতার কথা কাউকে বলারও উপায় নেই। বনলতাকে নীরবে নিভৃতে স্মরণ করতে হয় অপরাধবোধ নিয়ে। তাই কবি বলেছেন, ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এ অন্ধকার প্রাকৃতিক নয়, এ অন্ধকার মানসিক। আমার জানামতে নিষিদ্ধ প্রেমের আনন্দ ও বেদনা এত সুন্দরভাবে আর কোন কবি ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।২”

 

জীবনানন্দ গবেষক অধ্যাপক আবু তাহের মজুমদার অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন তাঁর আলোচনা গ্রন্থ ‘জীবনানন্দ’৩ এর বনলতা সেন শিরোনামের প্রবন্ধে। তাঁর মতে, বনলতা সেন আসলে বরিশালের এক ভদ্র ঘরের মেয়ে। তিনি দাবি করেন,  জীবনানন্দের  ‘কারুবাসনা’ উপন্যাসে তেমন বর্ণনার ইঙ্গিত তিনি পেয়েছেন। বনলতা ছিলেন জীবনানন্দের পাশের বাড়ির একজন নারী।

 

জীবনানন্দ দাশের কারুবাসনা উপন্যাসে বনলতা সেন সম্পর্কে আমরা যা জানতে পারি–

 

‘কিশোরবেলায় যে মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোনো এক বসন্তের ভোরে বিশ বছর আগে সুর ও যৌবনে উত্তরআকাশে দিগঙ্গনা সেজে এসেছে। দক্ষিণ আকাশে সে-ই বিগত জীবনের কৃষ্ণা মণি, পুব আকাশ ঘিরে তারই নিটোল কালো মুখ। নক্ষত্রমাখা রাত্রির কালো দিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার। —প্রিয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী চমরীর মতো অপরূপ রূপ। মিষ্টি ক্লান্ত অশ্রু-মাধ্য চোখ, নগ্ন শীতল নিরাবরণ দুখানা হাত, ম্লান ঠোঁট, পৃথিবীর নবীন জীবন ও নবলোকের হাতে প্রেমে, বিচ্ছেদ ও বেদনার সেই পুরোনো পল্লির দিনগুলো সমর্পণ করে কোন দূর নিঃস্বাদ নিঃসূর্য অভিমানহীন মৃত্যুর উদ্দেশে তার যাত্রা । / সেই বনলতা— আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে । কুড়ি – বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে : বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল । দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললে সে। তারপর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকেই আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তারপর খিড়কির পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে । নিবিড় জামরুল গাছটার নিচে একবার দাঁড়াল , তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল ।/ তারপর তাকে আর আমি দেখিনি । / অনেক দিন পরে আজ আবার সে এল ; মনপবনের নৌকায় চড়ে , নীলাম্বরী শাড়ি পরে , চিকন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে আবার সে এসে দাঁড়িয়েছে ; মিষ্টি অশ্ৰু – মাখা চোখ , ঠাণ্ডা নির্জন দুখানা হাত , ম্লান ঠোঁট , শাড়ির ম্লানিমা । সময় থেকে সময়ান্তর , নিরবচ্ছিন্ন , হায় প্রকৃতি , অন্ধকারে তার যাত্রা— ।৪

 

 

বিশিষ্ট জীবনানন্দ গবেষক এবং জীবনানন্দের সাহচর্যে আসা অশোক মিত্র এক নতুন তথ্য নিয়ে হাজির হন। তিনি বলেন,

‘এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এল, সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, না কি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের জবার পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছিলেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন, সে-সমস্ত খবর বেরোত। হয়তো ১৯৩২ সাল হবে, নয়তো পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহী থেকে নাটোর তো একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহোত্তর পর্বে অন্য পদবি ব্যবহার করতেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কি না। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়।”৫

 

 

 

জীবনানন্দ দাশ এর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি “বনলতা সেন” কবিতা দিয়েই শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর লেখা তাঁর এ কবিতা, যখন মৃত্য ও ধ্বংশযজ্ঞ ক্রিয়াশীল নানাভাবে কবিমনে। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বহুল চর্চিত অভিযোগ, তিনি নির্জনতার কবি, নিঃসঙ্গতার কবি, নির্জন রাস্তায় চলা আত্মনিমগ্ন একান্ত কবি যুবরাজ, মৃত্যু চেতনাবোধে আচ্ছন্ন মানুষ। প্রকৃতির কবি। বাংলার নদী, মাঠ, প্রান্তর, অরণ্য, পাখপাখালি, সবুজ শষ্যখেত, আকাশ, নক্ষত্ররাজি তাঁর মানস দর্পণে তিলোত্তমা এক নগরী।

 

‘বনলতা সেন’ স্থূল বিচারে একটি নিছক প্রেমের কবিতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সঞ্জাত একটি প্রেমের কবিতা, যে কবিতার রহস্য চরিত্র এক নারী যখন কবি বলেন— “আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন”।

আমার বিচারে, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিকে যদি একটি নিরেট প্রেমের কবিতা হিসেবেও ধরা হয় তাহলেও এটি একটি পরাবাস্তব (surrealism) গোত্রের প্রেমের কবিতা এবং কবিতার ‘বনলতা সেন’ মেয়েটি একটি নিরপেক্ষ সত্তা, বনলতা সেন কবির একার না, সকলের আরাধ্যা, দিনশেষে সকল মানুষের একমাত্র , এবং অবশ্যম্ভাবী ঠিকানা।

 

 

বনলতা সেন কবিতাটি যেন এক সুদূরের সুরলহরী, বেলা শেষে পথ হারানো পথিকের আবার সেই পথে ফিরে আসা, তাঁর মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করা। সে ক্লান্ত পথশ্রান্ত। মহাকালের পথ ধরে যেন সে নিরন্তর চলমান। সুদীর্ঘ ক্লান্তিকর পথ পরিক্রমা  শেষে সে খুঁজে পায় শান্তির এক নীড়–এক মোহনীয় রমণীর –, বনলতা যার নাম, নাটোরের বনলতা সেন!

কবি যেমনটি বলেছেন,

‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতি দূর সমুদ্রের পর

হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’

 

কবি বনলতা সেনকে আশ্রয় হিসেবে খুঁজে পেয়ে মন্ত্রমুগ্ধ, তৃপ্ত, প্রাণিত। কুহক ছড়িয়েছে বনলতার চুল, তার মুখ। পাখির নীড়ের মতো চোখ তাঁকে নতুন করে মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছে, অভিমানের সুরে বনলতা যখন জিজ্ঞেস করে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

 

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর যাপিত জীবনের আখ্যানের যবনিকা টানেন এক দার্শনিক ভাবনায়। তিনি বলেন,

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে–সব নদী–ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

 

একজন মানুষের যাপিত জীবনের উদয় অস্ত আছে, সূর্যোদয় সূর্যাস্ত আছে, দিন শেষে আসে সন্ধ্যা, ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল, তার মানে বর্ণিল জীবনের গল্পকথার শেষ হয়, তখন আয়োজন চলে অভিজ্ঞতার ঝুড়ি মেলে ধরা, গল্প লেখার পালা পাখিদের নীড়ে ফেরা নিয়ে, এ যেন সমস্ত প্রতীক্ষার অবসান, বনলতার কোলে নিজেকে সঁপে দেয়া।

Edgar Allan Poe এর কবিতা ‘To Helen’ দ্বারা জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন” কবিতাটি প্রভাবিত বলে অনেকে অভিযোগ করেন । এখানে পাঠকের সুবিধার জন্য বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ এর ‘শুদ্ধতম কবি ‘ গ্রন্থ থেকে Edgar Allan Poe এর কবিতা To Helen এবং হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী-কৃত অনুবাদ যথাক্রমে তুলে ধরা হলো:

 

‘Helen, thy beauty is to me

Like those Nicéan barks of yore,

 

That gently, o’er a perfumed sea,

The weary, way-worn wanderer bore

To his own native shore.

 

On desperate seas long wont to roam,

Thy hyacinth hair, thy classic face,

Thy Naiad airs have brought me home

To the glory that was Greece,

And the grandeur that was Rome.

 

 

Lo! in yon brilliant window-niche

How statue-like I see thee stand,

The agate lamp within thy hand!

Ah, Psyche, from the regions which

Are Holy-Land!’

 

এই কবিতার হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী-কৃত রূপান্তর:

‘হেলেন , তোমার মুখ নিসিয়ার জাহাজের মতো

পাড়ি দিত গন্ধময় একখানি সমুদ্রের বুকে , ঘরহারা নাবিকের পরিচিত তীরে পৌছে দিত, নিরাপদ নীড়ে তার, জন্মভূমি,উত্তরিত শোকে,

পুরাকালে লক্ষ্যভেদী আমোঘ যাত্রার সুখে – দুখে ।

বেপরোয়া উয়ে – ঢেউয়ে ঢের ঘুরে ক্লান্ত বহুদিন

তোমার ধ্রুপদী মুখ , ভেসে-আসা হায়াসিন্থ চুল,

হে নায়াড়, তোমার লীলা, হে অপ্সরী বিলীন জলের বিভঙ্গে, – তুমি উন্মোচিত করো মর্মমূলে

রোমের ঐশ্বর্য আর গ্রীসের মহিমা প্রাচীন।

দেখো, শুধু চেয়ে থাকি , অপলক, অদূরবর্তিনী

গবাক্ষে আশ্রিত তুমি , সন্নিকট নিঃশব্দ মূরতি মূৰ্চ্ছাহত, মায়াবিনী, যেন থেমে আছে তার গতি,

হাতখানি ধরে আছে ধাতুর প্রদীপ। বলতে নেই ,

আ, তুমি সাইকী , তুমি তীর্থভূমি হতে আনা রতি।’৬

 

জীবনানন্দ দাশের কবিতা ‘বনলতা সেন’ পাঠে আমার তা মনে হয়নি, বরং এটা বলা যৌক্তিক ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির সাথে Edgar Alan Poe এর To Helen কবিতার যতটুকু সাযুজ্য তা কাকতালীয়; বনলতা সেন কবিতার ব্যাপ্তি, রূপকল্প ও চিত্রময়তা বহুগুণে বেশি এবং তা জীবনানন্দিয়, দেশজ রূপকল্প, চিত্রকল্প, শব্দচয়ন, বিন্যাস ও বিষয় বৈচিত্রে অনন্য। আসলে ‘বনলতা সেন’ একটি রূপকাশ্রয়ী পরাবাস্তব প্রেমের কবিতা। এখানে ‘বনলতা সেন’ একটি রূপক নারী চরিত্র, (তবে বস্তুতপক্ষে একটা নিরপেক্ষ সত্তা)—-মৃত্যুর কুহকজাল বিস্তারকারী কুহকিনী। আর জীবনানন্দ দাশ মহাকালের কবি, এক অর্থে মানব সভ্যতার প্রতিনিধি, মহাকালের ধারক ও বাহক, যিনি পুনঃপুন জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে গেছেন মহাকালের সমস্ত ঘটনাবলিকে নিজের ভেতর ধারণ করে। “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।”

 

কবি ও গবেষক মাসুদুল হক তাঁর গবেষণাগ্রন্থ “জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য” এর ” ‘বনলতা সেন’: কবিতার অন্বয় ও সাঙ্গীতিক নন্দনতত্ত্ব” প্রবন্ধে  যেমনটা বলেছেন,

“প্রেমেন্দ্র মিত্রই প্রথম জানিয়েছিলেন ‘ বনলতা সেন ‘ কবিতায় অ্যালেন পো রচিত ‘ To Helen ’ কবিতাটির সাদৃশ্য বিদ্যমান । তবে সাদৃশ্যের বেড়াজাল অতিক্রম করে কবিতাটি আমাদের পাঠক – হৃদয়ে একটি মিথ হিসেবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । মিথ বলতে আমরা বুঝি : “ বাস্তব ও স্বপ্নের সেতুবন্ধ , মানুষ যা হতে চেয়েছে তারই আদর্শ , যা সে প্রকাশ করতে চেয়েছে তারই মূর্তায়ন । ” আর এই ক্ষেত্রে আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে , ‘ বনলতা সেন ‘ কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের ‘ ব্যক্তিগত মিথ ‘ , যা সার্বজনীন মিথে পরিণত হয়েছে । কবিতার মানসচর্যা ব্যক্তিগতকে সমষ্টিগত অধি আয়তনিক পরিসরে ; আত্মাকে নৈরাত্মে , অভিজ্ঞতাকে বহুনন্দিত সারাংশে , দ্যোতককে অবিশ্রাম দ্যোতনায় স্পন্দিত এবং বিলম্বনে ; অত্যুচ্চ কল্পনাকে ব্যবহারিকে নিয়ে আসে । আর এভাবে বিষয় ও বিষয় – সত্তার পারম্পর্য , দৃশ্যকল্পে – উপমায় – বাকপ্রতিমায় মরমের দুয়ার খুলে জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘ বনলতা সেন ’ কবিতাকে উপস্থাপন করেছেন ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যক্তিক যাদুবৃত্তে ( magic circle )।’৭

 

কবিতাটির প্রথম স্তবকে হাজার বছর ব্যাপী পথাচলা ক্লান্তিকর এক পথিকের ভ্রমণের কথা বলা হয়েছে। আসলে একজন একক ব্যক্তির পক্ষে হাজার বছর ধরে পথচলা একটি অলীক কল্পনা। এখানে প্রকৃতপক্ষে মানব সভ্যতার পথ পরিক্রমার কথাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। তাঁর পুনঃপুন জন্ম এবং মৃত্যু হয়েছে, মানব সভ্যতার বয়সী একজন মানুষের পক্ষে সেটা খুব সম্ভব। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ক্ষণকাল বিরতির পর আবারও জন্ম এবং পথ পরিক্রমা শুরু। তিনি হাজার বছর (এখানে হাজার বছর অনির্দিষ্টকাল অর্থে) ধরে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে ফিরেছেন;- সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর অবধি যার পরিব্যাপ্তি। বিম্বিসার আশোকের জগতে তাঁর উপস্থিতি, বিম্বিসারের করুণ মৃত্যু, এবং আশোকের অনুতাপ, এখন সেসব ধূসর ধুলোমলিন স্মৃতি। তিনি দূরবর্তী নগরী বিদর্ভেও গেছেন, অর্থাৎ মহাকালের সমস্ত ঘটনাবলির ভেতর তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। চারিদিকে দেখেছেন জীবন সমুদ্রের কর্মচাঞ্চল্য, আবার সফেন হয়ে সমুদ্রেই মিলিয়ে যাওয়া, জীবনের পৌনঃপুনিকতা। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা জীবন মৃত্যুর ভেতর দিয়ে কবিকে ক্লান্ত করে তুলেছে, জীবনের চিন্তা ও কর্মযজ্ঞের ভারে তিনি অবসাদগ্রস্ত। এই ক্লান্তিকর অস্তিত্বের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য শান্তির ঝলক নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল মৃত্য (মৃত্যুতে মানুষের অবসাদ, চিন্তা ও কর্মযজ্ঞের ভার দূর হয়)— বনলতা সেন, মোহনীয় নারী, তার আলিঙ্গন, তার সোহাগ , পাখির নীড়ের মাদকতা।(এখানে নাটরের বনলতা সেন একটি রূপক, এই রূপকের মধ্য দিয়ে তিনি  বাংলার নারীদের পতিপ্রেমের দিকটিও তুলে ধরেছেন)। আরো বলা যায়, হিন্দু ধর্মের জন্মান্তরবাদ, পুনঃপুন জন্ম ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং নির্বাণ লাভের মধ্য  আত্মিক মহামুক্তি এবং বৌদ্ধ দর্শন অনুসারে  মোক্ষলাভ মৃত্যুর প্রতীকী চরিত্র বনলতা সেনকে প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে।

কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে কবি বনলতা সেনের আশ্চর্য নান্দনিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন বাস্তব ও পরাবাস্তব ভাবনার সমন্বয় ঘটিয়ে—— “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’ পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” বনলতা সেনের চুলের রং যেন দূর আদিম অন্ধকার নগরী বিদিশার( বিদিশা একটি পাপ পূণ্যে নিমজ্জিত নগরী) মতো, এমন রং আসলে মৃত্যরূপী রমণীর এবং মুখ যেন পরিত্যক্ত নগরী শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মতো ভুতুড়ে, ভেতরে গহীন অন্ধকার। প্রাণসংকটে নিমজ্জিত জাহাজঢুবি নাবিকের সবুজ তৃণভূমির দ্বীপ দারুচিনি দেখে যেমন আশান্বিত হন, বাঁচার আশায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, ঠিক তেমনি যেন কবি বনলতা সেনকে অন্ধকারে আবিষ্কার করেছেন, আবিষ্কার করেছেন অন্ধকারের রাণী মৃত্যুকে। মৃত্যরূপী বনলতার সবিনয় জিজ্ঞাসা, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ জীবনকে ভালোবাসে এই যে হাজার বছর ধরে জীবন সমুদ্রে তোমার পরিভ্রমণ, চষে বেড়ালে ভূগোলের নানা প্রান্তে, ইতিহাস চর্চা করলে, কিন্তু কী পেলে? দিনশেষে তো আমার কাছেই ফিরে আসতে হচ্ছে তোমাকে! মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে—মোহনীয় রমণী বনলতা( মৃত্যুর আর এক নাম) সেনকেই। আসলে, মৃত্য কাউকেই ফেরায় না, নির্বিশেষে সবাইকে পাখির নীড়ের মমতা, পাখির নীড়ের চোখ দিয়ে আগলে রাখে।

 

তৃতীয় স্তবকে দেখা যায় দিনশেষে কবি জীবনের হিসেব মেলাতে বসে যান—— “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” রূপকল্প ও চিত্রময়তার ভেতর দিয়ে তিনি এই স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে চান যে, জীবনের সবকিছুই একদিন ফুরিয়ে যায়, হেমন্তের শিশিরের মতো ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে, আকাশচারী চিল জীবনের সোনালি অধ্যায় শেষে ঘরে ফিরে আসে, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পৃথিবী স্থবির হয়ে আসে, তখন জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত ধূসর পাণ্ডুলিপি শেষ সম্বল হয়ে যায়, টিপটিপে জোনালির আলোয় তখন অভিজ্ঞতা চর্বনের শেষ সময়, জীবনের সব দায় পরিশোধ করে—– “সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;” এবং সামনে তখন অনিবার্য মৃত্যুই অবশিষ্ট থাকে এবং শেষ ভরসা তখন মৃত্যরূপী মোহনীয় প্রেমিকা রমণী বনলতা সেন, যে সবাইকে আপন মমতা দিয়ে বুকে টেনে নেয়।

 

সর্বোপরি এ কথাও বলা যায়, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি একটি দেশপ্রেম ভিত্তিক কবিতাও বটে। বাংলার রূপ-সৌন্দর্য তাঁকে মোহিত করে, তিনি পুনঃপুন বাংলায় জন্মগ্রহণ করতে চান, তাকে ভালোবেসে মরতে চান। প্রাচীন বাংলার এক সময়ের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পীঠস্থান নাটোরকে তিনি প্রতীকী অর্থে বাংলা হিসেবে বেছে নেন এবং সেখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করতে চান এবং রূপক অর্থে নাটোরের বনলতা সেনকে তিনি  তাঁর প্রেমিকা হিসেবে আশ্রয় করে শান্তি খুঁজে পেতে চান। তিনি বহু দেশ, জনপদ ঘুরে বেড়িয়েছেন, সাগর মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন, বিম্বিশার অশোকের ধূসর জগতে, বিদর্ভ নগরে বিচরণ করেছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি বলতে যা বুঝায় তা তিনি পাননি, পরিশেষে সংবেদনশীল কবির ক্লান্তি নিবারণ করেছে তাঁর জন্মস্থান বাংলা, প্রতীকী নাটোর, প্রতীকী নারী বনলতা সেন, তাঁকে মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছে।

 

তথ্যপঞ্জি:

 

১. জীবনানন্দ দাশ, বনলতা সেন, প্রকাশক-নন্দিনী গুপ্ত, ২৫/৪, কবি মহঃ ইকবাল রোড, কলকাতা ২৩

 

২. আকবর আলি খান, পরার্থপরতার অর্থনীতি,  দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেড ক্রিসেন্ট হাউস, ৬১, মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ ২০০০।

 

৩. আবু তাহের মজুমদার, জীবনানন্দ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেড ক্রিসেন্ট বিল্ডিং ১১৪, মতিঝিল সি. এ–,ঢাকা-১০০০,বাংলাদেশ, ২০০২।

 

৪. জীবনানন্দ দাশ, কারুবাসনা, জীবনানন্দ সমগ্র (তৃতীয় খন্ড): দেবেশ রায় সম্পাদিত। প্রতিক্ষণ, কলকাতা, ১৯৮৬ পৃ: নং -১৯৭

 

৫. অশোক মিত্র, আপিলা-চাপিলা, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।

 

৬. আবদুল মান্নান সৈয়দ, শুদ্ধতম কবি, প্রকাশক- সহিদুল ইসলাম বিজু , তৃতীয় পাঠক সমাবেশ সংস্করণ: জানুয়ারি ২০১১

পৃ ১৪৫-১৪৬

 

৭. মাসুদুল হক, জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, কম্পিউটার কমপ্লেক্স মার্কেট, ৩৮/৩ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০, প্রথম প্রকাশ, একুশে বইমেলা ২০১১, পৃ ৫০

———–

 

নিরঞ্জন রায়

কবি ও প্রাবন্ধিক

অধ্যাপনা, ইংরেজি সাহিত্য

পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ, ঠাকুরগাঁও

মোবাইল নং: 01710869030