
রাশেদ ইসলাম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে। বিএনপির ভেতরে মনোনয়ন ঘিরে দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক দলাদলি ও মারামারি যেন একের পর এক নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত – কোথাও না কোথাও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, অনিশ্চয়তা আর নেতৃত্বের টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।
গত কয়েক মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রাণহানির ঘটনাও কম নয়। দলীয় সূত্র ও বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মনোনয়ন বিতর্ক ও গ্রুপিং নিয়ে সারা দেশে অন্তত ৪০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক এলাকায় একাধিক প্রার্থী নিজেদের “দলীয়” বলে দাবি করছেন, আবার কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ বা মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে মাঠের রাজনীতিতে একটা বিষয় স্পষ্ট—বিএনপি এখনো ঐক্যবদ্ধ চেহারায় ফিরে আসতে পারেনি। মনোনয়ন বিলম্ব, নেতৃত্বের অস্পষ্টতা আর গ্রুপিংয়ের কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
অন্যদিকে, বিএনপির এই ভেতরভাগের টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর জন্য। দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ থাকা দলটি এখন নতুন করে মাঠে সংগঠিত হচ্ছে। সম্প্রতি আদালতের রায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সুযোগ পাওয়ার পর জামায়াত সংগঠন গোছাচ্ছে নতুন ধাঁচে—পুরনো কাঠামো বদলে তরুণ প্রজন্ম ও স্থানীয় সংগঠনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
জামায়াতের কৌশল এখন অনেকটাই স্পষ্ট—তারা চাইছে নিজেদের “নতুন রূপে” তুলে ধরতে। শুধু ধর্মীয় দল নয়, বরং ‘নৈতিক ও পরিবর্তনমুখী রাজনীতি’র বার্তা নিয়ে মাঠে নামছে তারা। ফলে বিএনপির সংগঠন ও মনোনয়ন সংকটে যখন ভোটারদের মধ্যে হতাশা, তখন জামায়াত সেই ফাঁকটা কাজে লাগাচ্ছে—যাকে অনেকে বলছেন, “ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ।”
অপরদিকে ভোটারদের মনোভাব,বিভ্রান্তি, হতাশা ও বিকল্প খোঁজার চেষ্টা
ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, তারা এখন আর বড় দলের ইতিহাস বা নাম শুনে মুগ্ধ হন না। সাধারণ মানুষ এখন চায় মাঠে কাজ করা, জনগণের পাশে থাকা ও স্পষ্ট পরিকল্পনা দেওয়া প্রার্থী। কিন্তু বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঝামেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দুর্বল যোগাযোগে ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
এর বিপরীতে জামায়াতের মাঠপর্যায়ের সংগঠন ও ধারাবাহিক প্রচারণা কিছু এলাকায় ভোটারদের আগ্রহ কাড়ছে। বিশেষ করে যেখানে বিএনপি বিভক্ত, সেখানে জামায়াতের তৎপরতা দৃশ্যমান। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশও সোশ্যাল মিডিয়া ও স্থানীয় ক্যাম্পেইনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
তবে এটাও সত্য, জামায়াতের পুরনো ইমেজ—বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ও অতীত রাজনৈতিক বিতর্ক—এখনও অনেক ভোটারের মনে প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে দলটি “বিকল্প শক্তি” হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পেতে এখনো সময় লাগবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির বর্তমান অবস্থান এক কথায় দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত। মনোনয়ন সংকট, আঞ্চলিক কোন্দল ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় অস্পষ্টতা দলটিকে জনগণের কাছে বিভক্ত হিসেবে উপস্থাপন করছে। আর এই সময়টাতেই জামায়াত তাদের সংগঠন গোছানোর সুযোগ পেয়েছে।
রাজনীতির ভাষায় বলা যায়, “যখন প্রতিপক্ষ বিশৃঙ্খলায়, তখন সুযোগ নেয় দূরদর্শী দল।” জামায়াত এখন ঠিক সেটাই করছে।
তবে আগামী নির্বাচনের আগে কে মাঠে টিকে থাকবে, আর কে সংগঠন ধরে রাখতে পারবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ জনগণের মন এখন পরিবর্তনের দিকে, কিন্তু সেই পরিবর্তন কাদের মাধ্যমে ঘটবে—সেটি এখনও স্পষ্ট নয়।
আমি রাশেদ ইসলাম একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণে, বিএনপি যদি দ্রুত ভেতরকার দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে, তাহলে মাঠে জামায়াত বা অন্যান্য উদীয়মান শক্তি আরও এগিয়ে যাবে। সাধারণ ভোটাররা এখন আর শুধু দল নয়—চায় নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা, বিশ্বাস ও ফলাফল। সেই জায়গায় বিএনপি পিছিয়ে, আর জামায়াত ধীরে ধীরে সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে।
Reporter Name 






















