বাংলাদেশ ০৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাউনিয়ার প্রকৌশলী আরিফের চমক: টি-ট্রি পাতায় বছরে ৩০ লাখ টাকার তেল উৎপাদন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:০৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ৯৩ Time View

(উচ্চমূল্যের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল তৈরিতে সাফল্য; বিদেশফেরত তরুণ উদ্যোক্তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ১০ জনের)

মন্জুরুল আহসান শামীম

স্টাফ রিপোর্টারঃ গাছের পাতা থেকে তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্যের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল—শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হরিশ্বর গ্রামের প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আরিফ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। তাইওয়ানের একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি পীরগাছা উপজেলার শ্রীকান্ত গ্রামে শুরু করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান টি-ট্রি গাছের চাষ। বর্তমানে তাঁর এই প্রকল্প থেকে তেল ও হাইড্রোসল ওয়াটার উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা থেকে চলতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

 

আরিফের শুরুটা ছিল নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে। বিদেশ থেকে সরাসরি চারা আনতে না পেরে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সাইট থেকে বীজ সংগ্রহ করেন তিনি। কিন্তু বীজ থেকে চারা উৎপাদনে দেখা দেয় জটিলতা। স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহায়তায় তিন বছরের প্রচেষ্টায় মাত্র ৪০টি চারা উৎপাদনে সফল হন আরিফ। এরপর সেই চারাগুলোর কাটিং থেকে ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয় চাষাবাদ। বর্তমানে এক একর জমিতে তাঁর প্রকল্পে রয়েছে ২ হাজারের বেশি টি-ট্রি গাছ।

 

নিজস্ব প্রযুক্তিতে তেল উৎপাদন

গাছ বড় হওয়ার পর পাতা থেকে তেল উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। আরিফ চীন থেকে ছোট একটি ডিস্টিলেশন মেশিন এনে সেটি বিশ্লেষণ করে স্থানীয়ভাবে ৫০০ লিটার ধারণক্ষমতার একটি বড় মেশিন তৈরি করেন। এখন সেই মেশিন দিয়েই তিনি পেশাদারভাবে অ্যাসেনশিয়াল অয়েল ও হাইড্রোসল ওয়াটার উৎপাদন করছেন।

 

শ্রমিকরা বর্তমানে স্টিম ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে পাতা থেকে তেল আলাদা করার কাজে ব্যস্ত। প্রতিদিন তিন ব্যাচে ৫০ কেজি করে পাতা ব্যবহার করে দেড় লিটার অ্যাসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

 

বিশ্ব বাজারে চাহিদা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি

আরিফের উৎপাদিত পণ্য দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বিক্রি হচ্ছে। তাঁর এই প্রকল্পকে ঘিরে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

 

উদ্যোক্তা আরিফ জানান, “টি-ট্রি পাতার তেল ও হাইড্রোসল বিশ্বব্যাপী স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে ব্যবহৃত হয়। বৈদেশিক বাজারে এর চাহিদা খুব বেশি। সরকার রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করলে আমরা রফতানির মাধ্যমে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারব।”

 

পীরগাছা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামসুজ্জামান বলেন, “শুরু থেকেই আমরা আরিফকে সহায়তা করেছি। রংপুরের মাটি টি-ট্রি চাষের জন্য বেশ অনুকূল। কেউ এ ধরনের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করলে কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রংপুরে অস্ট্রেলিয়ান টি-ট্রি চাষ ও অ্যাসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনে আরিফের এই সফলতা নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

কাউনিয়ার প্রকৌশলী আরিফের চমক: টি-ট্রি পাতায় বছরে ৩০ লাখ টাকার তেল উৎপাদন

Update Time : ০১:০৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

(উচ্চমূল্যের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল তৈরিতে সাফল্য; বিদেশফেরত তরুণ উদ্যোক্তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ১০ জনের)

মন্জুরুল আহসান শামীম

স্টাফ রিপোর্টারঃ গাছের পাতা থেকে তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্যের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল—শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হরিশ্বর গ্রামের প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আরিফ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। তাইওয়ানের একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি পীরগাছা উপজেলার শ্রীকান্ত গ্রামে শুরু করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান টি-ট্রি গাছের চাষ। বর্তমানে তাঁর এই প্রকল্প থেকে তেল ও হাইড্রোসল ওয়াটার উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা থেকে চলতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

 

আরিফের শুরুটা ছিল নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে। বিদেশ থেকে সরাসরি চারা আনতে না পেরে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সাইট থেকে বীজ সংগ্রহ করেন তিনি। কিন্তু বীজ থেকে চারা উৎপাদনে দেখা দেয় জটিলতা। স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহায়তায় তিন বছরের প্রচেষ্টায় মাত্র ৪০টি চারা উৎপাদনে সফল হন আরিফ। এরপর সেই চারাগুলোর কাটিং থেকে ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয় চাষাবাদ। বর্তমানে এক একর জমিতে তাঁর প্রকল্পে রয়েছে ২ হাজারের বেশি টি-ট্রি গাছ।

 

নিজস্ব প্রযুক্তিতে তেল উৎপাদন

গাছ বড় হওয়ার পর পাতা থেকে তেল উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। আরিফ চীন থেকে ছোট একটি ডিস্টিলেশন মেশিন এনে সেটি বিশ্লেষণ করে স্থানীয়ভাবে ৫০০ লিটার ধারণক্ষমতার একটি বড় মেশিন তৈরি করেন। এখন সেই মেশিন দিয়েই তিনি পেশাদারভাবে অ্যাসেনশিয়াল অয়েল ও হাইড্রোসল ওয়াটার উৎপাদন করছেন।

 

শ্রমিকরা বর্তমানে স্টিম ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে পাতা থেকে তেল আলাদা করার কাজে ব্যস্ত। প্রতিদিন তিন ব্যাচে ৫০ কেজি করে পাতা ব্যবহার করে দেড় লিটার অ্যাসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

 

বিশ্ব বাজারে চাহিদা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি

আরিফের উৎপাদিত পণ্য দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বিক্রি হচ্ছে। তাঁর এই প্রকল্পকে ঘিরে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

 

উদ্যোক্তা আরিফ জানান, “টি-ট্রি পাতার তেল ও হাইড্রোসল বিশ্বব্যাপী স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে ব্যবহৃত হয়। বৈদেশিক বাজারে এর চাহিদা খুব বেশি। সরকার রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করলে আমরা রফতানির মাধ্যমে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারব।”

 

পীরগাছা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামসুজ্জামান বলেন, “শুরু থেকেই আমরা আরিফকে সহায়তা করেছি। রংপুরের মাটি টি-ট্রি চাষের জন্য বেশ অনুকূল। কেউ এ ধরনের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করলে কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রংপুরে অস্ট্রেলিয়ান টি-ট্রি চাষ ও অ্যাসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনে আরিফের এই সফলতা নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।