বাংলাদেশ ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেই তরুণ বেলাল উদ্দিন, যিনি এলাকার মানুষজনের কাছে পরিচিত ডালিম নামে, বর্তমানে কক্সবাজারের রামু উপজেলার সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে এক প্রভাবশালী এবং ভয়ের নাম হিসেবে উঠে এসেছে।

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৩২:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১১১ Time View

স্টাফ রিপোর্টার: স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি এখন কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্যের মালিক, যার কেন্দ্রে রয়েছে অবৈধ সিগারেট ও ইয়াবা চোরাচালানের নেটওয়ার্ক।

 

দারিদ্র্যের ঘর থেকে সিন্ডিকেটের শীর্ষে স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ডালিম রামু উপজেলার খুনিয়া পালং ইউনিয়নের পূর্ব গোয়ালিয়া গ্রামের আব্দুল করিম ও শুকতারা বেগম দম্পতির ছেলে। ২০০১ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণের শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। সংসার চালাতে তিনি সিএনজি চালাতেন। সেই সময়েই সীমান্ত সংলগ্ন চোরাচালানি চক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। প্রথমদিকে ছোট চালান বহনের কাজ করলেও পরে ধীরে ধীরে নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক।

 

একজন স্থানীয় সিএনজি চালক বলেন, “ডালিম আগে আমাদের সঙ্গে গাড়ি চালাত। কিন্তু এখন শুধু চালান নিয়ন্ত্রণ করে। এত অল্প বয়সে এত টাকা আর প্রভাব দেখে সবাই হতবাক।”

 

ইয়াবা সাপ্লাই নেটওয়ার্কের অভিযোগ

স্থানীয়দের দাবি, শুরুতে তিনি মিয়ানমার থেকে আনা অবৈধ সিগারেটের চালান বেচাকেনা করতেন। পরে এতে যুক্ত হয় ইয়াবা। বর্তমানে তার রয়েছে পূর্ণাঙ্গ সাপ্লাই চেইন। কেউ চালান বহন করে, কেউ পাহারা দেয়, আর কেউ স্থানীয়ভাবে দরজায় দরজায় সরবরাহে যুক্ত থাকে।

 

কয়েক বছরের মধ্যেই তার জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটে। খুনিয়াপালং এলাকায় তিনি নির্মাণ করেন দোতলা বাড়ি, ব্যবহার করেন দামি মোটরগাড়ি এবং সম্প্রতি প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিয়ের আয়োজনও করেন বলে এলাকার বাসিন্দারা জানান। এছাড়া নামে-বেনামে জমি কেনাসহ নানা সম্পদের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

কয়েক মাস আগে বিজিবি তাকে অবৈধ সিগারেটের চালানসহ আটক করেছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ছাড়া পান এবং ঘটনাটি নিয়ে এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।

 

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “ওর টাকার জোরে অনেক কিছুই সম্ভব হয়ে যায়। চেকপোস্ট বা তদন্ত সব কিছু টাকায় ম্যানেজ হয়ে যায়।”

 

ভাইরাল অডিওর পরও নীরবতা

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডালিমের কথিত একটি কল রেকর্ড ভাইরাল হয়। সেখানে তিন কাট ইয়াবা বেচাকেনা নিয়ে আলোচনা শোনার দাবি করে স্থানীয়রা। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ আরও বাড়ে।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডালিম বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টাকা দিয়ে অডিওটি সরানোর চেষ্টা করেছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রায়ই রামু থানার কিছু অসাধু কর্মকর্তার কাছ থেকে জব্দকৃত মাদক কম দামে কিনে থাকে। অভিযানে জব্দ করা মাদক কম দেখিয়ে বাকি অংশ বিক্রি করা হয় এবং সেখানে ডালিম অন্যতম ক্রেতা হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয়দের দাবি।

 

এই বিষয়ে ডালিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করলে মামলা করে দেব।”

 

যুবসমাজ ধ্বংসের শঙ্কা

ডালিমের উত্থান শুধুই ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি পুরো এলাকার সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তার টাকার প্রলোভনে এলাকার অনেক তরুণ অপরাধের পথে ঝুঁকে পড়ছে। কেউ ইয়াবা বহন করছে, কেউ পাহারা দিচ্ছে, আবার কেউ সরবরাহ চক্রের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

 

একজন স্কুল শিক্ষক বলেন, “ডালিম এখন তরুণ সমাজের জন্য ভয়ানক হুমকি। অল্প সময়ে টাকা পাওয়ার লোভে ছেলেরা ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।”

 

কঠোর পদক্ষেপের দাবি

স্থানীয়দের মতে, এখনই আইনি ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি না বাড়ালে সীমান্ত এলাকায় আরও নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

সেই তরুণ বেলাল উদ্দিন, যিনি এলাকার মানুষজনের কাছে পরিচিত ডালিম নামে, বর্তমানে কক্সবাজারের রামু উপজেলার সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে এক প্রভাবশালী এবং ভয়ের নাম হিসেবে উঠে এসেছে।

Update Time : ০২:৩২:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫

স্টাফ রিপোর্টার: স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি এখন কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্যের মালিক, যার কেন্দ্রে রয়েছে অবৈধ সিগারেট ও ইয়াবা চোরাচালানের নেটওয়ার্ক।

 

দারিদ্র্যের ঘর থেকে সিন্ডিকেটের শীর্ষে স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ডালিম রামু উপজেলার খুনিয়া পালং ইউনিয়নের পূর্ব গোয়ালিয়া গ্রামের আব্দুল করিম ও শুকতারা বেগম দম্পতির ছেলে। ২০০১ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণের শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। সংসার চালাতে তিনি সিএনজি চালাতেন। সেই সময়েই সীমান্ত সংলগ্ন চোরাচালানি চক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। প্রথমদিকে ছোট চালান বহনের কাজ করলেও পরে ধীরে ধীরে নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক।

 

একজন স্থানীয় সিএনজি চালক বলেন, “ডালিম আগে আমাদের সঙ্গে গাড়ি চালাত। কিন্তু এখন শুধু চালান নিয়ন্ত্রণ করে। এত অল্প বয়সে এত টাকা আর প্রভাব দেখে সবাই হতবাক।”

 

ইয়াবা সাপ্লাই নেটওয়ার্কের অভিযোগ

স্থানীয়দের দাবি, শুরুতে তিনি মিয়ানমার থেকে আনা অবৈধ সিগারেটের চালান বেচাকেনা করতেন। পরে এতে যুক্ত হয় ইয়াবা। বর্তমানে তার রয়েছে পূর্ণাঙ্গ সাপ্লাই চেইন। কেউ চালান বহন করে, কেউ পাহারা দেয়, আর কেউ স্থানীয়ভাবে দরজায় দরজায় সরবরাহে যুক্ত থাকে।

 

কয়েক বছরের মধ্যেই তার জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটে। খুনিয়াপালং এলাকায় তিনি নির্মাণ করেন দোতলা বাড়ি, ব্যবহার করেন দামি মোটরগাড়ি এবং সম্প্রতি প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিয়ের আয়োজনও করেন বলে এলাকার বাসিন্দারা জানান। এছাড়া নামে-বেনামে জমি কেনাসহ নানা সম্পদের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

কয়েক মাস আগে বিজিবি তাকে অবৈধ সিগারেটের চালানসহ আটক করেছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ছাড়া পান এবং ঘটনাটি নিয়ে এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।

 

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “ওর টাকার জোরে অনেক কিছুই সম্ভব হয়ে যায়। চেকপোস্ট বা তদন্ত সব কিছু টাকায় ম্যানেজ হয়ে যায়।”

 

ভাইরাল অডিওর পরও নীরবতা

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডালিমের কথিত একটি কল রেকর্ড ভাইরাল হয়। সেখানে তিন কাট ইয়াবা বেচাকেনা নিয়ে আলোচনা শোনার দাবি করে স্থানীয়রা। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ আরও বাড়ে।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডালিম বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টাকা দিয়ে অডিওটি সরানোর চেষ্টা করেছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রায়ই রামু থানার কিছু অসাধু কর্মকর্তার কাছ থেকে জব্দকৃত মাদক কম দামে কিনে থাকে। অভিযানে জব্দ করা মাদক কম দেখিয়ে বাকি অংশ বিক্রি করা হয় এবং সেখানে ডালিম অন্যতম ক্রেতা হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয়দের দাবি।

 

এই বিষয়ে ডালিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করলে মামলা করে দেব।”

 

যুবসমাজ ধ্বংসের শঙ্কা

ডালিমের উত্থান শুধুই ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি পুরো এলাকার সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তার টাকার প্রলোভনে এলাকার অনেক তরুণ অপরাধের পথে ঝুঁকে পড়ছে। কেউ ইয়াবা বহন করছে, কেউ পাহারা দিচ্ছে, আবার কেউ সরবরাহ চক্রের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

 

একজন স্কুল শিক্ষক বলেন, “ডালিম এখন তরুণ সমাজের জন্য ভয়ানক হুমকি। অল্প সময়ে টাকা পাওয়ার লোভে ছেলেরা ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।”

 

কঠোর পদক্ষেপের দাবি

স্থানীয়দের মতে, এখনই আইনি ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি না বাড়ালে সীমান্ত এলাকায় আরও নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।