
রাশেদ ইসলাম, বিশেষ সংবাদদাতা, জয়পুরহাটঃ জয়পুরহাট জেলায় থাকা প্রাচীন মসজিদ, মাজার, দিঘি ও জমিদার বংশের নিদর্শন সহ কয়লা ও চুনাপাথরের খনিজ সম্পদ যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় জেলা ও দেশের অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখতে পারে।
রাজশাহী বিভাগের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত জয়পুরহাট জেলা বহির্বিশ্বে কৃষি ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শত শত বছরের ইতিহাস। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের ধর্মীয় স্থাপনা, সুফি সাধকদের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন দিঘি এবং জমিদার বংশের নিদর্শন আজও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে এসব ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনার বড় অংশই আজ বিলুপ্তির পথে। ইতিহাসবিদদের মতে, জয়পুরহাট অঞ্চল প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির অংশ। নদী, উর্বর জমি ও জলাধারের কারণে এখানে বহু শতাব্দী ধরে জনবসতি গড়ে ওঠে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম শাসনামলের ধারাবাহিক প্রভাব এই অঞ্চলের স্থাপনা ও সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সদর উপজেলায় ‘বার শিবালয়’ স্থানটি প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় নিদর্শনের সাক্ষ্য বহন করে। এখানে একসময় বারটি শিবলিঙ্গ বা শিবমন্দির হিসেবে পরিচিত ছিল। যদিও বর্তমানে দৃশ্যমান কাঠামো আগের মত নেই, তবে নাম ও স্মৃতি স্থানীয়দের মধ্যে টিকে আছে। আমদই ইউনিয়নের বাঁকিলা গ্রামে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পুরোনো অফিস ভবন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এটি ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের প্রশাসনিক স্থাপনা।
কয়তাহার গ্রামের মীর সাহেব ওলির মাজার বহু বছর ধরে স্থানীয় মানুষের আস্থার কেন্দ্র। মাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রাচীন মাদ্রাসা ও বৃহৎ পুকুর রয়েছে, যা ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রাচীন বসতির ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। সদর উপজেলায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, ব্রিটিশ আমলের জয়পুরহাট রেলওয়ে জংশন এবং তুলশীগঙ্গা নদীর তীর জেলার আধুনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ক্ষেতলাল উপজেলায় অবস্থিত হিন্দা কসবা শাহী মসজিদ জেলা ও এলাকার অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা। স্থানীয় ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুঘল আমলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগত সুফি সাধকদের মধ্যে দিয়ে হযরত আব্দুল গফুর চিশতী (রহ.) ও তাঁর সহযোগীদের উদ্যোগে মসজিদটি নির্মিত হতে পারে। ইটের তৈরি এই মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে area’s মুসলিম ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতি সাভাবিক রেখেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া ক্ষেতলাল উপজেলায় আরেকটি প্রাচীন শাহী মসজিদ রয়েছে, যা মুঘল স্থাপত্যরীতির নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
পাঁচবিবি উপজেলায় শাহী মসজিদ ও খ্রিস্টান গির্জা জেলা ইতিহাসের ধর্মীয় বৈচিত্র্য প্রদর্শন করে। গির্জা সংলগ্ন এলাকায় ‘পাথরঘাটা’ নামে পরিচিত একটি স্থান রয়েছে, যেখানে পুরোনো পাথরের কাঠামোর চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়া পুরাতন হাট ও বাজার এলাকা একসময় বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
কালাই উপজেলায় অবস্থিত নান্দাইল দিঘি একটি প্রাচীন বৃহৎ জলাধার। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এটি জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে খনন করা হয়েছিল। দিঘিটি আজও area’s প্রাচীন বসতির সাক্ষ্য বহন করছে। একই উপজেলায় একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপনার স্মৃতি বহন করে।
আক্কেলপুর উপজেলায় ব্রিটিশ আমলের জমিদার বংশের বসতবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। একসময় এই পরিবার স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
শিল্প খাতের দিক থেকেও জেলা গুরুত্বপূর্ণ। জয়পুরহাট সুগার মিল দেশের অন্যতম বৃহৎ চিনিকল এবং জেলার শিল্পায়নের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সচেতন মহল মনে করেন, এই স্থাপনা ও নিদর্শন দ্রুত তালিকাভুক্ত করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে জয়পুরহাট জেলার বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন চিরতরে হারিয়ে যাবে।
এদিকে জয়পুরহাট জেলার খনিজ সম্পদও উল্লেখযোগ্য। জামালগঞ্জ এলাকায় বড় পরিমাণ কয়লার মজুদ রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিকভাবে ব্যবহার হয়নি। Geological Survey of Bangladesh অনুসারে, জেলা অঞ্চলে প্রায় ১০৫ কোটি টনের মতো কয়লা মজুদ চিহ্নিত। চুনাপাথরের মজুদও সদর ও পাঁচবিবি উপজেলায় পাওয়া গেছে, যা সিমেন্ট ও নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
যদি এসব খনিজ সম্পদ সঠিকভাবে উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তাহলে এটি এলাকার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিরাট অবদান রাখতে পারে। কয়লা ও চুনাপাথর উত্তোলন দেশের শক্তি নিরাপত্তা বৃদ্ধি, স্থানীয় রাজস্ব আয় ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে। তবে এর সাথে জড়িত রয়েছে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি। খনি খোলার ফলে জলাধার, মাটি ও স্থানীয় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সঠিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরকারী নীতি ছাড়া খনিজ সম্পদ থেকে পূর্ণ সুবিধা অর্জন সম্ভব নয়।
জয়পুরহাট জেলা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমৃদ্ধি হিসেবে পরিচিত। জেলার প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণ এবং খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার একসঙ্গে এলাকার ঐতিহ্য রক্ষা ও অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও সংরক্ষণমূলক উদ্যোগই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জেলা ও দেশের উপকারে আসবে।
Reporter Name 






















