বাংলাদেশ ১০:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নবীগঞ্জ প্রেসক্লাব ধ্বংসের নেপথ্যে কারা?

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:০৮:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৭৯ Time View

** ভবন নির্মাণে বাধা, গঠনতন্ত্র বিকৃতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।

নবীগঞ্জ প্রতিনিধি :

রাষ্ট্রের তথাকথিত চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত নবীগঞ্জ প্রেসক্লাব আজ গভীর সংকট, প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী সাংবাদিক সংগঠন ৫৮ বছর অতিক্রম করেও নিজস্ব ভবন গড়ে তুলতে ব্যর্থ—যা কেবল ব্যর্থতা নয়, বরং পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের ফল বলে মনে করছেন সচেতন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ।

 

 

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী প্রেসক্লাবকে সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করেছে। সাংবাদিকতার আদর্শ ও পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং পদ-পদবি, প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধাই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান লক্ষ্য। ১৯৯৫ সালের পর থেকে পেশাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত ভাগ্য গড়ার যে প্রবণতা শুরু হয়, সময়ের ব্যবধানে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

 

 

সাবেক সভাপতি মরহুম এটিএম নুরুল ইসলাম খেজুর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ বাছিতসহ দায়িত্বশীল নেতারা বারবার প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও প্রতিবারই রাজনৈতিক দালালি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে সেই উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ আজ আর অজানা নয়।

 

 

২০২৪ সালে নির্বাচিত কমিটি ৪৬ বছর পর হলেও সাংবাদিকদের জন্য একটি স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিলে হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন তথাকথিত সিনিয়র সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন মিঠু। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ, অবমাননাকর ও মানহানিকর মন্তব্য ছড়ান যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা তো বটেই, ন্যূনতম শালীনতারও চরম লঙ্ঘন।

 

 

গঠনতন্ত্র পরিপন্থী ও ক্লাববিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে সেই সিদ্ধান্ত আজও কার্যকর হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে কারা তাকে রক্ষা করছে? কোন শক্তির আশ্রয়ে তিনি বারবার দায়মুক্তি পাচ্ছেন?

২০১২ সালে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আনোয়ার হোসেন মিঠু যে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন, তা সাংবাদিকদের কল্যাণের দলিল নয়; বরং অল্প কয়েকজনের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার হাতিয়ার এমন অভিযোগ তুলেছেন একাধিক সাংবাদিক। সেই বিতর্কিত ও বিকৃত গঠনতন্ত্রই আজ নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবকে বিভক্ত, দুর্বল ও কার্যত অকার্যকর করে রেখেছে।

 

 

অভিযোগ আরও গুরুতর-২০১২ সালে ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাবের সভাপতি থাকাকালে তিনি আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব না দিয়েই রেজুলেশন খাতা গায়েব করে রাখেন। এরপরও নৈতিকতার বয়ান শোনানোকে অনেকেই রীতিমতো তামাশা হিসেবে দেখছেন।

সাংবাদিক কল্যাণ ফান্ড নিয়েও উঠেছে বিস্ফোরক প্রশ্ন। গঠনতন্ত্রে কল্যাণ ফান্ডের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে একটি টাকাও নেই।

 

 

প্রতিবছর উপজেলাবাসীর কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদান সংগ্রহ করা হলেও কমিটির মেয়াদ শেষে ব্যাংক হিসাব শূন্য এই অর্থ গেল কোথায়? কারা এর সুবিধাভোগী? প্রশাসন কি আদৌ এর জবাবদিহি চাইবে?

৫ আগস্টের আগে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের কতজন সাংবাদিক রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এই প্রশ্নও আজ জোরালোভাবে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্লাবের বাইরের অনেক সাংবাদিক জীবন ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও ভেতরের একটি অংশ নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।

 

 

অন্যদিকে, দু’একজন অসৎ সাংবাদিকের কর্মকাণ্ডের দায় আজ পুরো সাংবাদিক সমাজকে জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অসহায় চা দোকানদার দেবলকে উচ্ছেদ করে অনুমতিহীনভাবে জায়গা দখল করে, প্রেসক্লাবের সব সদস্যের মতামত ছাড়াই সেখানে ঘর নির্মাণের ঘটনাকে অনেকেই চরম অন্যায় ও অনৈতিক বলে মনে করছেন।

 

 

বর্তমানে ক্লাবের তালিকাভুক্ত ৪৮ জন সদস্যের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে নিয়মিত সাংবাদিকতা করছেন—সেই প্রশ্নও এখন অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। প্রেসক্লাব কি সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান, নাকি সুবিধাভোগী ও ক্ষমতার দালালদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নবীগঞ্জবাসী।

 

 

এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতি সচেতন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের জোর দাবি—নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের আর্থিক লেনদেন, গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, সদস্য তালিকা ও পূর্ববর্তী কমিটিগুলোর ভূমিকা নিয়ে গোপন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় ‘প্রেসক্লাব’ নামটি বহাল রাখা জাতির সঙ্গে এক নির্মম প্রতারণার শামিল হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

নবীগঞ্জ প্রেসক্লাব ধ্বংসের নেপথ্যে কারা?

Update Time : ০৭:০৮:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

** ভবন নির্মাণে বাধা, গঠনতন্ত্র বিকৃতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।

নবীগঞ্জ প্রতিনিধি :

রাষ্ট্রের তথাকথিত চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত নবীগঞ্জ প্রেসক্লাব আজ গভীর সংকট, প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী সাংবাদিক সংগঠন ৫৮ বছর অতিক্রম করেও নিজস্ব ভবন গড়ে তুলতে ব্যর্থ—যা কেবল ব্যর্থতা নয়, বরং পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের ফল বলে মনে করছেন সচেতন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ।

 

 

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী প্রেসক্লাবকে সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করেছে। সাংবাদিকতার আদর্শ ও পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং পদ-পদবি, প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধাই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান লক্ষ্য। ১৯৯৫ সালের পর থেকে পেশাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত ভাগ্য গড়ার যে প্রবণতা শুরু হয়, সময়ের ব্যবধানে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

 

 

সাবেক সভাপতি মরহুম এটিএম নুরুল ইসলাম খেজুর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ বাছিতসহ দায়িত্বশীল নেতারা বারবার প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও প্রতিবারই রাজনৈতিক দালালি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে সেই উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ আজ আর অজানা নয়।

 

 

২০২৪ সালে নির্বাচিত কমিটি ৪৬ বছর পর হলেও সাংবাদিকদের জন্য একটি স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিলে হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন তথাকথিত সিনিয়র সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন মিঠু। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ, অবমাননাকর ও মানহানিকর মন্তব্য ছড়ান যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা তো বটেই, ন্যূনতম শালীনতারও চরম লঙ্ঘন।

 

 

গঠনতন্ত্র পরিপন্থী ও ক্লাববিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে সেই সিদ্ধান্ত আজও কার্যকর হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে কারা তাকে রক্ষা করছে? কোন শক্তির আশ্রয়ে তিনি বারবার দায়মুক্তি পাচ্ছেন?

২০১২ সালে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আনোয়ার হোসেন মিঠু যে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন, তা সাংবাদিকদের কল্যাণের দলিল নয়; বরং অল্প কয়েকজনের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার হাতিয়ার এমন অভিযোগ তুলেছেন একাধিক সাংবাদিক। সেই বিতর্কিত ও বিকৃত গঠনতন্ত্রই আজ নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবকে বিভক্ত, দুর্বল ও কার্যত অকার্যকর করে রেখেছে।

 

 

অভিযোগ আরও গুরুতর-২০১২ সালে ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাবের সভাপতি থাকাকালে তিনি আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব না দিয়েই রেজুলেশন খাতা গায়েব করে রাখেন। এরপরও নৈতিকতার বয়ান শোনানোকে অনেকেই রীতিমতো তামাশা হিসেবে দেখছেন।

সাংবাদিক কল্যাণ ফান্ড নিয়েও উঠেছে বিস্ফোরক প্রশ্ন। গঠনতন্ত্রে কল্যাণ ফান্ডের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে একটি টাকাও নেই।

 

 

প্রতিবছর উপজেলাবাসীর কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদান সংগ্রহ করা হলেও কমিটির মেয়াদ শেষে ব্যাংক হিসাব শূন্য এই অর্থ গেল কোথায়? কারা এর সুবিধাভোগী? প্রশাসন কি আদৌ এর জবাবদিহি চাইবে?

৫ আগস্টের আগে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের কতজন সাংবাদিক রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এই প্রশ্নও আজ জোরালোভাবে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্লাবের বাইরের অনেক সাংবাদিক জীবন ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও ভেতরের একটি অংশ নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।

 

 

অন্যদিকে, দু’একজন অসৎ সাংবাদিকের কর্মকাণ্ডের দায় আজ পুরো সাংবাদিক সমাজকে জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অসহায় চা দোকানদার দেবলকে উচ্ছেদ করে অনুমতিহীনভাবে জায়গা দখল করে, প্রেসক্লাবের সব সদস্যের মতামত ছাড়াই সেখানে ঘর নির্মাণের ঘটনাকে অনেকেই চরম অন্যায় ও অনৈতিক বলে মনে করছেন।

 

 

বর্তমানে ক্লাবের তালিকাভুক্ত ৪৮ জন সদস্যের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে নিয়মিত সাংবাদিকতা করছেন—সেই প্রশ্নও এখন অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। প্রেসক্লাব কি সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান, নাকি সুবিধাভোগী ও ক্ষমতার দালালদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নবীগঞ্জবাসী।

 

 

এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতি সচেতন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের জোর দাবি—নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের আর্থিক লেনদেন, গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, সদস্য তালিকা ও পূর্ববর্তী কমিটিগুলোর ভূমিকা নিয়ে গোপন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় ‘প্রেসক্লাব’ নামটি বহাল রাখা জাতির সঙ্গে এক নির্মম প্রতারণার শামিল হবে।