
শামীম আহমেদ: নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চান—দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সকল নেতা-কর্মীকে দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ দিতে হবে, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে গুজব ছড়ানোও বরদাশত করা হবে না। রাষ্ট্র এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই সহ্য করবে না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ইতিহাস শিক্ষা দেয়—ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না; বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছে।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই ঈমান, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করবেন।
প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারাদেশে ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বডি ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো—ভোটাররা যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ও মর্যাদার সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিচ্ছেন—যা গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। এই অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
একই সঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এটি প্রমাণ করে—রাষ্ট্র কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়।
ভোটাধিকার প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ভোটাধিকার কারও দয়া নয়; এটি সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই জনগণ নির্ধারণ করে দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে এবং এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে, যা সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল। এ জন্য তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
তবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির বিষয়টি গভীর বেদনার বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে—যা দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থী সংখ্যা দুই হাজারের বেশি।
তিনি বলেন, এটি শুধু একটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণের সাংবিধানিক প্রকাশ ঘটছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
Reporter Name 


















