বাংলাদেশ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলার নববর্ষের আদি কথা 

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:১৬:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫৫ Time View

এডঃ এফ এম এ রাজ্জাক , “পহেলা বৈশাখ উৎসবটা বরাবরই একসময়ের ধনী শোষক শ্রেণি থেকে আগত। কিন্তু এটি বাঙ্গালিদের ভুয়া ঐতিহ্য ধারণ করে একসময়ের কৃষকদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে না বুঝে এই উৎসব পালন হত। এই উৎসবের পিছনে রয়েছে কয়েকশ বছরের এক করুন ইতিহাস।

বৈশাখের আগের দিন ৩০ চৈত্র সংক্রান্তির দিনে, ঋণে জর্জরিত চাষিদের বড়শিতে গেঁথে ঘোরানো হত চড়কের গাছে, পরের দিন যেন কোন কিছু না ঘটে এজন্য একটা আনন্দের দিন হিসেবে পালন করতো দিন টি। ঐ সময়ের নিষ্ঠুর জমিদারেরা।

~ এমনিতেই চৈত্রমাস হল রুক্ষ মাস, এই সময় মানুষের বিশেষ কোনোকাজ থাকে না। আগেকার দিনে সাধারণ মানুষ বাড়ির উঠোনে বসে পাটের দড়ি পাকাত অথবা মুখে লোকগান গাইত। রাঢ়দেশের মানুষ এই সময় পালা বোলান বা পরী বোলানের মহড়া করত গাজনের জন্য। কিন্তু পূর্ববঙ্গের চৈত্র মাসের নিয়ম কানুন ছিল কিছুটা আলাদা।

এখানে জমিদাররা প্রজাদের খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন স্থির করেছিলেন ৩০ চৈত্র। মরা মাসে এমনিতেই মানুষের হাতে টাকা পয়সা কম থাকত। তার উপর ফি বছর খরা, বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়। খাজনা দেওয়ার জ্বালায় বহু প্রান্তিক চাষি বাধ্য হত আত্মহত্যা করতেও। এটা ছিল জমিদার-মহাজন ও ব্যবসায়ী সম্মিলিত ফাঁদ, যেখানে প্রতিটি মানুষ পা দিতে বাধ্য হতে। অভাবের তাড়নায় হোক বা নিত্যপ্রয়োজনে, দায়ে পড়ে এই তিন শ্রেণীর কাছে যেত এবং সর্বস্ব খুইয়ে ঘরে ফিরত তারা। প্রয়োজনে মহাজনরা পাইক পাঠিয়ে আদায় করতেন তাঁদের সমস্ত সুদ-আসল।

লেখক আখতার উল আলম তার লেখা নববর্ষ ও বাংলার লোক সংস্কৃতি বইতে লিখেছেন তিনি পূর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে পেয়েছিলেন এক নিষ্ঠুরতার কাহিনী যা বর্ণনা দিয়েছেন এ ভাবে। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বরিশালের জমিদাররা তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যদিও চড়ক সংক্রান্তিতে বড়শি ফোঁড়া বা বাণ ফোঁড়া ছিল প্রথমে অপেক্ষাকৃত নীচ সম্প্রদায়ের প্রথা। ব্রাহ্মণরা অংশগ্রহণ করতেন না। কিন্তু খাজনা আদায় করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাশ হওয়ার জমিদাররা এই প্রথা বাজেভাবে ব্যবহার করেন। ১৮০০ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় এটা চলেছিল। এর মধ্যে ১৮৬৫ সালে ইংরেজরা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল নিষ্ঠুরতা দেখে( বাণ ফোঁড়া, বড়শি ফোঁড়া ইত্যাদি)।

 

যদিও বাংলাতে এটা শুরু হয়েছিল ১৪৮৫ সালে, রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের আমলে। তখন তাঁদের রাজপরিবারেই এটা পালন করা হত। পরে তা ছড়িয়ে যায় পূর্ববঙ্গের সমস্ত প্রদেশে।

 

কয়েকজন জমিদার ছিলেন আরও এগিয়ে। তাঁরা আবার প্রজাদের জমিদার বাড়িতে আকৃষ্ট করার জন্য জমিদার বাড়ির চত্বরে কবিগান, লাঠিখেলা এবং হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করতেন। কারণ এই সময় সমস্ত প্রজাদের আসতেই হত এখানে খাজনা দেওয়ার জন্য।

 

জমিদারবাড়ি থেকেই আগেই ঘোষণা করা হত যে, সাল তামামির খাজনা সবটা শোধ করলে আলাদা করে কোনো সুদ লাগবে না। তাই দলে দলে মানুষ সেখানে উপস্থিত হতে এবং এই সুযোগে জমিদাররা বছরে একবারই মাত্র তাঁদের মুখমণ্ডলটি নিয়ে প্রজাদের সামনে সগৌরবে দর্শন দিতেন।

কিন্তু যারা খাজনা দিতে পারত না? তাঁদের কী হত? ফসল খারাপ হলে তাদের মাফ করে দেওয়া হত? সে ইতিহাস পাওয়া যায় না। পূর্ববঙ্গের জমিদাররা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের নিয়ে লেঠেল দল তৈরি করতেন। সেই দলের ভয়ে বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খেত। সেই লেঠেল দল গোটা জমিদারি এলাকায় প্রজাদের শাসিয়ে বেড়াত। পাশাপাশি, প্রায়ই ৩০ চৈত্রের মধ্যে পুরো খাজনা জমা দিতে বাধ্য করত।

আসলে, সেসব জায়গায় কবিগানের আয়োজন বা লাঠিখেলা সবই ছিল প্রজাদের মনস্তাত্ত্বিক সম্মোহনের জন্য বিনোদন। সাতদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজনের উদ্দেশ্যই ছিল খাজনা আদায়ের একটি কৌশল। এর সঙ্গে যোগ করা হয় ধর্মীয় আবরণকে। পূর্ববঙ্গে যিনি লোকপাল (শিব) নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁকেই এই অনুষ্ঠানের প্রধান দেবতা হিসাবে পূজা করা শুরু হয়। এর আরেকটি কারণ ছিল কৃষিদেবতা হিসাবে লোকপালের লৌকিক খ্যাতি, অথচ পশ্চিমবঙ্গের মূল শিবের গাজনের সঙ্গে তার কোনো মিলই ছিল না। তাই লাঠিখেলা, কবিগান থেকে ঢাকের বাজনা বাজতে শুরু করলেই প্রজাদের কাছে দুটি রাস্তা খোলা থাকত। হয় মহাজনের কাছে গিয়ে ঘটিবাটি বন্ধক দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা, না হয় পাইক-লেঠেলদের হাতে বন্দি হয়ে মোটা বড়শির সূচালো ফলায় গিয়ে ঝুলে পড়া। এবং, চড়কের গোটা বিকালে রক্তাক্ত পিঠে চিৎকার করতে করতে, জমিদার আর সাধারণ মানুষকে কষ্টের অভিনয় করে দেখানো।

এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে যেত। তাদের পরোক্ষভাবে যেন এটাই বোঝানো হত যে, খাজনা দেওয়া বাকি থাকলে তাদের অবস্থাও এরকম হতে পারে। এতে খুশি হয়ে জমিদার মশাইরা পাঁঠাবলি দিতেন, মেলার আয়োজন করতেন, আড়ং বসাতেন। সমগ্র অংশে জমিদারদের গলায় গলা মিলিয়ে সাহায্য করতেন সাহাশুঁড়ি, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা।

চড়ক পেরিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ, কৃষক শ্রেণী কেউই বৈশাখী নববর্ষের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। কারণ, ৩০ চৈত্রের ভয় তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিত। বরং বৈশাখী নববর্ষকে তৎকালীন সময়ে অনেকেই ব্যঙ্গের চোখে দেখতেন, তাই পণ্ডিত যোগশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধি তাঁর ‘পূজা-পার্বণ’ গ্রন্থে লিখেছিলেন – “কয়েক বৎসর হইতে পূর্ববঙ্গে ও কলিকাতার কেহ কেহ পয়লা বৈশাখ নববর্ষোৎসবের করিতেছে। তাহারা ভুলিতেছে বিজয়া দশমীই আমাদের নববর্ষারম্ভ। বৎসর দুটি নববর্ষোৎসব হইতে পারে না। পয়লা বৈশাখ বণিকরা নূতন খাতা করে৷ তাহারা ক্রেতাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া ধার আদায় করে৷ ইহার সহিত সমাজের কোনো সম্পর্ক নাই৷ নববর্ষ প্রবেশের নববস্ত্র পরিধানদির একটা লক্ষণও নাই।” যোগেশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধির মতে, বিজয়া দশমীই আমাদের নববর্ষ। আবার অনেকের মতে, অঘ্রাণ মাসই নববর্ষের মাস। কিন্তু কোনোভাবেই বৈশাখী নববর্ষ আমাদের আদি নববর্ষের সূচনালগ্ন ছিল না।

 

তাই অনেকে বলেন, বাঙালির প্রকৃত নববর্ষ ছিল অঘ্রান মাসের আমন ধান ওঠার পর, অর্থাৎ পয়লা অঘ্রাণ। গ্রামে গ্রামে নববর্ষ পালন করা হত নবান্ন উৎসবের মাধ্যমে। আকবরের আমলে অঘ্রাণ থেকে খাজনা নেওয়ার সময় বৈশাখ মাসে নিয়ে যাওয়া হয়, সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের মধ্যে তারতম্য দূর করতে। তবে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি ব্যবস্থা পাশ করার পর, বৈশাখ মাসের নববর্ষ আর চড়ক সংক্রান্তি যেন সাধারণ মানুষের মনে উৎসবের আনন্দ নয়, ভয়ার্ত জীবনের সূচনা করে।

লেখকঃ একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট, মানবাধিকার কর্মী, ও আইনজীবী, মোবাঃ 01711-075251

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

বাংলার নববর্ষের আদি কথা 

Update Time : ১০:১৬:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

এডঃ এফ এম এ রাজ্জাক , “পহেলা বৈশাখ উৎসবটা বরাবরই একসময়ের ধনী শোষক শ্রেণি থেকে আগত। কিন্তু এটি বাঙ্গালিদের ভুয়া ঐতিহ্য ধারণ করে একসময়ের কৃষকদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে না বুঝে এই উৎসব পালন হত। এই উৎসবের পিছনে রয়েছে কয়েকশ বছরের এক করুন ইতিহাস।

বৈশাখের আগের দিন ৩০ চৈত্র সংক্রান্তির দিনে, ঋণে জর্জরিত চাষিদের বড়শিতে গেঁথে ঘোরানো হত চড়কের গাছে, পরের দিন যেন কোন কিছু না ঘটে এজন্য একটা আনন্দের দিন হিসেবে পালন করতো দিন টি। ঐ সময়ের নিষ্ঠুর জমিদারেরা।

~ এমনিতেই চৈত্রমাস হল রুক্ষ মাস, এই সময় মানুষের বিশেষ কোনোকাজ থাকে না। আগেকার দিনে সাধারণ মানুষ বাড়ির উঠোনে বসে পাটের দড়ি পাকাত অথবা মুখে লোকগান গাইত। রাঢ়দেশের মানুষ এই সময় পালা বোলান বা পরী বোলানের মহড়া করত গাজনের জন্য। কিন্তু পূর্ববঙ্গের চৈত্র মাসের নিয়ম কানুন ছিল কিছুটা আলাদা।

এখানে জমিদাররা প্রজাদের খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন স্থির করেছিলেন ৩০ চৈত্র। মরা মাসে এমনিতেই মানুষের হাতে টাকা পয়সা কম থাকত। তার উপর ফি বছর খরা, বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়। খাজনা দেওয়ার জ্বালায় বহু প্রান্তিক চাষি বাধ্য হত আত্মহত্যা করতেও। এটা ছিল জমিদার-মহাজন ও ব্যবসায়ী সম্মিলিত ফাঁদ, যেখানে প্রতিটি মানুষ পা দিতে বাধ্য হতে। অভাবের তাড়নায় হোক বা নিত্যপ্রয়োজনে, দায়ে পড়ে এই তিন শ্রেণীর কাছে যেত এবং সর্বস্ব খুইয়ে ঘরে ফিরত তারা। প্রয়োজনে মহাজনরা পাইক পাঠিয়ে আদায় করতেন তাঁদের সমস্ত সুদ-আসল।

লেখক আখতার উল আলম তার লেখা নববর্ষ ও বাংলার লোক সংস্কৃতি বইতে লিখেছেন তিনি পূর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে পেয়েছিলেন এক নিষ্ঠুরতার কাহিনী যা বর্ণনা দিয়েছেন এ ভাবে। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বরিশালের জমিদাররা তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যদিও চড়ক সংক্রান্তিতে বড়শি ফোঁড়া বা বাণ ফোঁড়া ছিল প্রথমে অপেক্ষাকৃত নীচ সম্প্রদায়ের প্রথা। ব্রাহ্মণরা অংশগ্রহণ করতেন না। কিন্তু খাজনা আদায় করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাশ হওয়ার জমিদাররা এই প্রথা বাজেভাবে ব্যবহার করেন। ১৮০০ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় এটা চলেছিল। এর মধ্যে ১৮৬৫ সালে ইংরেজরা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল নিষ্ঠুরতা দেখে( বাণ ফোঁড়া, বড়শি ফোঁড়া ইত্যাদি)।

 

যদিও বাংলাতে এটা শুরু হয়েছিল ১৪৮৫ সালে, রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের আমলে। তখন তাঁদের রাজপরিবারেই এটা পালন করা হত। পরে তা ছড়িয়ে যায় পূর্ববঙ্গের সমস্ত প্রদেশে।

 

কয়েকজন জমিদার ছিলেন আরও এগিয়ে। তাঁরা আবার প্রজাদের জমিদার বাড়িতে আকৃষ্ট করার জন্য জমিদার বাড়ির চত্বরে কবিগান, লাঠিখেলা এবং হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করতেন। কারণ এই সময় সমস্ত প্রজাদের আসতেই হত এখানে খাজনা দেওয়ার জন্য।

 

জমিদারবাড়ি থেকেই আগেই ঘোষণা করা হত যে, সাল তামামির খাজনা সবটা শোধ করলে আলাদা করে কোনো সুদ লাগবে না। তাই দলে দলে মানুষ সেখানে উপস্থিত হতে এবং এই সুযোগে জমিদাররা বছরে একবারই মাত্র তাঁদের মুখমণ্ডলটি নিয়ে প্রজাদের সামনে সগৌরবে দর্শন দিতেন।

কিন্তু যারা খাজনা দিতে পারত না? তাঁদের কী হত? ফসল খারাপ হলে তাদের মাফ করে দেওয়া হত? সে ইতিহাস পাওয়া যায় না। পূর্ববঙ্গের জমিদাররা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের নিয়ে লেঠেল দল তৈরি করতেন। সেই দলের ভয়ে বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খেত। সেই লেঠেল দল গোটা জমিদারি এলাকায় প্রজাদের শাসিয়ে বেড়াত। পাশাপাশি, প্রায়ই ৩০ চৈত্রের মধ্যে পুরো খাজনা জমা দিতে বাধ্য করত।

আসলে, সেসব জায়গায় কবিগানের আয়োজন বা লাঠিখেলা সবই ছিল প্রজাদের মনস্তাত্ত্বিক সম্মোহনের জন্য বিনোদন। সাতদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজনের উদ্দেশ্যই ছিল খাজনা আদায়ের একটি কৌশল। এর সঙ্গে যোগ করা হয় ধর্মীয় আবরণকে। পূর্ববঙ্গে যিনি লোকপাল (শিব) নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁকেই এই অনুষ্ঠানের প্রধান দেবতা হিসাবে পূজা করা শুরু হয়। এর আরেকটি কারণ ছিল কৃষিদেবতা হিসাবে লোকপালের লৌকিক খ্যাতি, অথচ পশ্চিমবঙ্গের মূল শিবের গাজনের সঙ্গে তার কোনো মিলই ছিল না। তাই লাঠিখেলা, কবিগান থেকে ঢাকের বাজনা বাজতে শুরু করলেই প্রজাদের কাছে দুটি রাস্তা খোলা থাকত। হয় মহাজনের কাছে গিয়ে ঘটিবাটি বন্ধক দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা, না হয় পাইক-লেঠেলদের হাতে বন্দি হয়ে মোটা বড়শির সূচালো ফলায় গিয়ে ঝুলে পড়া। এবং, চড়কের গোটা বিকালে রক্তাক্ত পিঠে চিৎকার করতে করতে, জমিদার আর সাধারণ মানুষকে কষ্টের অভিনয় করে দেখানো।

এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে যেত। তাদের পরোক্ষভাবে যেন এটাই বোঝানো হত যে, খাজনা দেওয়া বাকি থাকলে তাদের অবস্থাও এরকম হতে পারে। এতে খুশি হয়ে জমিদার মশাইরা পাঁঠাবলি দিতেন, মেলার আয়োজন করতেন, আড়ং বসাতেন। সমগ্র অংশে জমিদারদের গলায় গলা মিলিয়ে সাহায্য করতেন সাহাশুঁড়ি, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা।

চড়ক পেরিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ, কৃষক শ্রেণী কেউই বৈশাখী নববর্ষের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। কারণ, ৩০ চৈত্রের ভয় তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিত। বরং বৈশাখী নববর্ষকে তৎকালীন সময়ে অনেকেই ব্যঙ্গের চোখে দেখতেন, তাই পণ্ডিত যোগশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধি তাঁর ‘পূজা-পার্বণ’ গ্রন্থে লিখেছিলেন – “কয়েক বৎসর হইতে পূর্ববঙ্গে ও কলিকাতার কেহ কেহ পয়লা বৈশাখ নববর্ষোৎসবের করিতেছে। তাহারা ভুলিতেছে বিজয়া দশমীই আমাদের নববর্ষারম্ভ। বৎসর দুটি নববর্ষোৎসব হইতে পারে না। পয়লা বৈশাখ বণিকরা নূতন খাতা করে৷ তাহারা ক্রেতাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া ধার আদায় করে৷ ইহার সহিত সমাজের কোনো সম্পর্ক নাই৷ নববর্ষ প্রবেশের নববস্ত্র পরিধানদির একটা লক্ষণও নাই।” যোগেশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধির মতে, বিজয়া দশমীই আমাদের নববর্ষ। আবার অনেকের মতে, অঘ্রাণ মাসই নববর্ষের মাস। কিন্তু কোনোভাবেই বৈশাখী নববর্ষ আমাদের আদি নববর্ষের সূচনালগ্ন ছিল না।

 

তাই অনেকে বলেন, বাঙালির প্রকৃত নববর্ষ ছিল অঘ্রান মাসের আমন ধান ওঠার পর, অর্থাৎ পয়লা অঘ্রাণ। গ্রামে গ্রামে নববর্ষ পালন করা হত নবান্ন উৎসবের মাধ্যমে। আকবরের আমলে অঘ্রাণ থেকে খাজনা নেওয়ার সময় বৈশাখ মাসে নিয়ে যাওয়া হয়, সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের মধ্যে তারতম্য দূর করতে। তবে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি ব্যবস্থা পাশ করার পর, বৈশাখ মাসের নববর্ষ আর চড়ক সংক্রান্তি যেন সাধারণ মানুষের মনে উৎসবের আনন্দ নয়, ভয়ার্ত জীবনের সূচনা করে।

লেখকঃ একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট, মানবাধিকার কর্মী, ও আইনজীবী, মোবাঃ 01711-075251