বাংলাদেশ ০৮:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়ংকর জালিয়াতি ও অরাজকতার কবলে খুলনার মেট্রোপলিটন কলেজ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৫২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • ৪৮ Time View

বিশেষ প্রতিনিধি ,খুলনা :বর্তমানে জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং পেশি শক্তির আঁকড়া ও শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও জালিয়াতি এবং শিক্ষক কর্মচারী সহ সরকারি ফাইল পত্র লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

খুলনার অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মেট্রোপলিটন কলেজ’ এখন জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং পেশিশক্তির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মৃত ব্যক্তি ও ভূয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ, জাল সনদে এমপিওভুক্তি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কলেজের একটি চক্রের বিরুদ্ধে। বর্তমানে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিজ্ঞ জজ আদালত এবং মহামান্য হাইকোর্ট ও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

দুদকের সাঁড়াশি অভিযান ও তদন্ত

প্রাপ্ত তথ্যমতে, মেট্রোপলিটন কলেজের ১৬ জন প্রভাষক, প্রদর্শক ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল সার্টিফিকেট ও ভুয়া স্বাক্ষরে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। দুদকের ঢাকা কার্যালয়ের নির্দেশে যার স্মারক – (ক) দুদক, প্রকা, ঢাকার স্মারক নং – ০০.০১.০০০০.০০০.৬০৬.০১.০০১০.২৬.৮৫০৪, তারিখ – ০৮/০২/২০২৬ (খ) দুদক, প্রকা, ঢাকার ই/আর নং – মপ/তদন্ত/২/০২৫/২০২৬/খুলনা, তারিখ ১৪/০১/২০২৬। ও দুদক খুলনা স্মারক নং – ০০.০১.৪৭০০.৭৩২.০১.০০৪.২৬.৮৬৭, তারিখ ২৯/০৩/২০২৬। খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জনাব জাকির হোসেন বিষয়টি তদন্ত করছেন। আগামী ১২ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখের মধ্যে অভিযুক্তদের নিয়োগ সংক্রান্ত মূল কাগজপত্র, বিদেশ গমনের অনুমতিপত্র এবং এমপিও সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি মৃত ডিজির প্রতিনিধি ও বিষয় বিশেষজ্ঞদের স্বাক্ষর জাল করে এবং খণ্ড কালিন নিয়োগ হতে পূর্ণ কালিন নিয়োগ ও ভুয়া সার্টিফিকেট ও কাম্য যোগ্যতার অর্জনের আগে ভূয়া নিয়োগ, ১৪ জন শিক্ষক কর্মচারীর জাল সার্টিফিকেট ধারি এবং পূর্ব অনুমতি না নিয়ে অবৈধ ভাবে বিদেশ ভ্রমণ, মব সৃষ্টি করে কলেজ দখল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে জোর পূর্বক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও হিসাব ও নিরিক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) -কে ফাঁকি দিয়ে ২০০৬ ও ২০১৫ সনের মিনিষ্ট্রি অডিটের ব্রডসিট জবাব না দেওয়া তার পরিপ্রেক্ষিতে বিগত ইংরেজি মাওশি কর্তৃক ৩৭.০২.০০০০.১০৫.০১.১৭.২০২৬.১১১, তারিখ – ৩১/০৩/২০২৬ ইং পত্র মোতাবেক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালী ব্রড সিট জবাব প্রেরনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছে, কলেজের সাধারন, বি এম ও ডিগ্রি শাখার শিক্ষার্থীদের ফর্ম পুরনের টাকা বর্তমান অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, অবৈধ সভাপতি ও অবৈধ শিক্ষক প্রতিনিধি দ্বয় টাকা আত্মসাত করেছে এবং মিনিষ্ট্রী অডিটে ঘুষ বানিজ্য পঁচিশ লক্ষ টাকা ও দুদক এর তদন্ত রোধের জন্য ভূয়া কাগজ পত্র তৈরির অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালীর স্বাক্ষর জাল করে এবং পূর্ববর্তী গভর্নিং বডি সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ, টপসিট, রেজুলেশন বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন এর চিঠিপত্র তৈরি এর মহোৎসব চলছে ।

জালিয়াতির হোতা ও ‘মব’ সৃষ্টিকারীঃ-

ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে ইংরেজি বিভাগের খণ্ডকালীন প্রভাষক এ এইচ এম মাহাবুবুর রহমান শামীমের নাম। ২০০৬ সালে এক অডিট চলাকালীন ২৬-২৭ জন সহকর্মীর স্বাক্ষর জাল করে তিনি তৎকালীন কমিটির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেন, যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়। সে সময় তিনি ক্ষমা চেয়ে অঙ্গীকারনামা দিলেও পরবর্তী সময়ে আবারো তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও স্বাক্ষর জালিয়াতির প্রমাণ পায় কলেজ কর্তৃপক্ষ।

গত ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, এই জালিয়াতি চক্রটি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ‘মব’ সৃষ্টি করে কলেজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ (রিট পিটিশন নং ১২৫৩২/২৪) অমান্য করে অবৈধ কমিটি গঠন ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।

লুটপাট ও নথিপত্র চুরির মহোৎসব

গত ২৩ অক্টোবর ২০২৪ রাতে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তাইফুজ্জামান, মাহাবুবুর রহমান শামীম ও তাদের সহযোগীরা মিলে অধ্যক্ষের কক্ষের তালা ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, ল্যাপটপ এবং মূল নথিপত্র লুট করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ডিআইএ অডিট চলাকালেও আলমারি ভেঙে দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যক্তিগত নথি ও কলেজের চেক বই, অধ্যক্ষের চেক বই, ব্ল্যাংক স্ট্যাম্প, মুল টপসিট ও খাতা পত্র, ডিগ্রি ও অনার্স নিয়োগ কৃত শিক্ষক কর্মচারীদের নিয়োগ সবক্রান্ত রেজুলেশন খাতা এবং ১৬ জন যাচাই কৃত শিক্ষক কর্মচারীর জাল সার্টিফিকেট এর প্রমান পত্র ও এর তথ্য উপাত্ত এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে বিদেশ ভ্রমণের সকল ডকুমেন্ট তথা পাসপোর্ট, ভিসার কপি স্ব স্ব ফাইল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে জালিয়াতির প্রমাণ লোপাট করা যায়। এই ঘটনায় আদালতে একাধিক ফৌজদারি মামলা ও সোনাডাঙ্গা থানায় জিডি করা হয়েছে, যার মামলা নং ১) মামলা নং- ১২৫৩২/২৪, তারিখ – ২৮/১০/২০২৪, ২) মামলা নং ৯৩/২০২৫ তারিখ ২৩/০৬/২০২৫, ৩) মামলা নং ১২৫৩২/২৪, তারিখ ২৮/১০/২০২৪, ৪) মামলার নং ৩৪/২৫, তারিখ -১৩/০৩/২০২৫, ৫) মামলার নং ৭০১/২৫, তারিখ ২০/০৫/২০২৫, ৬) মামলার নং ৮২৩/২৫ তারিখ -২৫/০৬/২০২৫, ৭)মামলার নং ৯২১/২৫, তারিখ ২২/০৭/২০২৫, ৮) মামলার নং ৭২/২৫, তারিখ ৩১/০৭/২০২৫, ৯) মামলা নং – ১১১১/২৫, তারিখ – ২৭/০৮/২০২৫, ১০) মামলা নং ১০২/২৫, তারিখ – ১২/১০/২০২৫। ইতিমধ্যে আরও বেশ কয়েকটি মামলা দ্বায়ের হইয়াছে যাহা চলমান এবং বর্তমান নতুন মামলা সহ ২৪ টি মামলা চলমান। কিছু মামলার নম্বর ও তারিখ গোপনীয়তা রক্ষার্থে তথ্য পেশ করা হইল না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানায় জি ডি নং বিগত ইংরেজি ০১/০২/২০২৬ তারিখ যার জি ডি নং ৫৭, ইংরেজি ২২/০১/২০২৬ তারিখ যার জি ডি নং ১৬০১।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের ও প্রাণনাশের হুমকিঃ-

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ জনাব দিবাকর বাওয়ালী, যিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তিনি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জালিয়াতি চক্রটি তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা এবং তার মেয়েকে অপহরণের হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ। বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় প্রাণভয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাছাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপনে কোন প্রতিষ্ঠান প্রধানের বেতন বন্ধ করা যাবে না মর্মে নির্দেশ থাকলেও মব সৃষ্টির মাধ্যমে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কলেজের একটি চক্র বিগত সেপ্টেম্বর ২০২৪ হতে ২০২৬ বর্তমান মাস পর্যন্ত বেতন ভাতা বন্ধ রেখেছে। এমনকি অবৈধ ভাবে বেতন ভাতা বন্ধ রেখেও বিধি মোতাবেক অর্ধ বেতন অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। যাহা বেআইনি বিধি বহির্ভূত।শিক্ষা মন্ত্রণালয় মহা পরিচালক ডিআইএ বরাবর তিনি কয়েকবার আবেদন দাখিল করিয়াছেন।কিন্তু কোন ফলাফল না আশার কারনে তিনি মহামান্য হাইকোর্টে এবং বিজ্ঞ জজ আদালতে মামলা দ্বায়ের এর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। মব সৃষ্টির কারনে অবৈধ সভাপতি সহ অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও দুষ্কৃতিকারী কয়েকজন শিক্ষক মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং- ৩৬৫৭/২০১৫ এর রায় আদেশ বাস্তবায়ন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, বেসরকারি মাধ্যমিক – ১, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা, স্মারক নং – ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৩১.০০৭.১৫.৬৯৪, তারিখ ০৬/০৮/২০১৭ ইং। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত ষাট দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হল অন্যথায় তাহা বাতিল বলিয়া গণ্য হবে যাহা তারা বিধি লঙ্ঘন করিয়াছে। কলেজের অবৈধ সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ পারভেজ বাবুর ছত্রছায়ায় এই চক্রটি কলেজে চাঁদাবাজি ও লুটপাট চালাচ্ছে। এমনকি সরকারি প্রজ্ঞাপন অমান্য করে গত কয়েক মাস ধরে বৈধ অধ্যক্ষের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে।

ভূয়া পদবী ব্যবহার করে প্রতারনার মাধ্যমে যশোর বোর্ড কর্তৃক এইচএসসি পরীক্ষা-২০২৪ এর পরীক্ষার খাতা সহকারী অধ্যাপকের পদ ব্যবহার করে প্রধান পরীক্ষক হওয়াঃ –

অত্র কলেজের ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক এ এইস এম মাহাবুবুর রহমান শামীম ও বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মাহাবুবুর রহমান মোড়ল ২০২৪ সনের পাবলিক পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষক হওয়ার নিমিত্তে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তাইফুজ্জামান এর সহযোগীতায় অনলাইনে ভুয়া পদবী সহকারী অধ্যাপক এর পদ ব্যবহার করে যশোর বোর্ড কর্তৃক প্রধান পরীক্ষক হন যাহা জালিয়াতি এবং প্রতারণা । একজন শিক্ষক হয়ে এহেন নিকৃষ্ট কাজের সহিত তারা জড়িত।

 

ধ্বংসের মুখে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম সরকারি সম্পদ এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ৯ টি সরকারি প্রজেক্টর, ল্যাপটপ চুরি আত্মসাৎঃ-

এক সময় যে কলেজের বিএম শাখায় পাসের হার ছিল ১০০% এবং সাধারণ শাখায় ৭০%, বর্তমানে এই অরাজকতার কারণে পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬%-এ। ল্যাব থেকে ১১টি প্রজেক্টর ও ৯টি ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় ব্যবহারিক শিক্ষাও লাটে উঠেছে।

প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন

এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক এবং সিটি মেয়রসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ ও ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। বর্তমানে উচ্চ আদালত ও জজ কোর্টে কলেজ সংশ্লিষ্ট ২১টিরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে।

সচেতন মহলের দাবি, দুদকের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই বিশাল জালিয়াতি চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হলে সরকারের কোটি কোটি টাকা রক্ষা পাবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

ভয়ংকর জালিয়াতি ও অরাজকতার কবলে খুলনার মেট্রোপলিটন কলেজ

Update Time : ০৭:৫২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ,খুলনা :বর্তমানে জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং পেশি শক্তির আঁকড়া ও শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও জালিয়াতি এবং শিক্ষক কর্মচারী সহ সরকারি ফাইল পত্র লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

খুলনার অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মেট্রোপলিটন কলেজ’ এখন জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং পেশিশক্তির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মৃত ব্যক্তি ও ভূয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ, জাল সনদে এমপিওভুক্তি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কলেজের একটি চক্রের বিরুদ্ধে। বর্তমানে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিজ্ঞ জজ আদালত এবং মহামান্য হাইকোর্ট ও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

দুদকের সাঁড়াশি অভিযান ও তদন্ত

প্রাপ্ত তথ্যমতে, মেট্রোপলিটন কলেজের ১৬ জন প্রভাষক, প্রদর্শক ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল সার্টিফিকেট ও ভুয়া স্বাক্ষরে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। দুদকের ঢাকা কার্যালয়ের নির্দেশে যার স্মারক – (ক) দুদক, প্রকা, ঢাকার স্মারক নং – ০০.০১.০০০০.০০০.৬০৬.০১.০০১০.২৬.৮৫০৪, তারিখ – ০৮/০২/২০২৬ (খ) দুদক, প্রকা, ঢাকার ই/আর নং – মপ/তদন্ত/২/০২৫/২০২৬/খুলনা, তারিখ ১৪/০১/২০২৬। ও দুদক খুলনা স্মারক নং – ০০.০১.৪৭০০.৭৩২.০১.০০৪.২৬.৮৬৭, তারিখ ২৯/০৩/২০২৬। খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জনাব জাকির হোসেন বিষয়টি তদন্ত করছেন। আগামী ১২ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখের মধ্যে অভিযুক্তদের নিয়োগ সংক্রান্ত মূল কাগজপত্র, বিদেশ গমনের অনুমতিপত্র এবং এমপিও সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি মৃত ডিজির প্রতিনিধি ও বিষয় বিশেষজ্ঞদের স্বাক্ষর জাল করে এবং খণ্ড কালিন নিয়োগ হতে পূর্ণ কালিন নিয়োগ ও ভুয়া সার্টিফিকেট ও কাম্য যোগ্যতার অর্জনের আগে ভূয়া নিয়োগ, ১৪ জন শিক্ষক কর্মচারীর জাল সার্টিফিকেট ধারি এবং পূর্ব অনুমতি না নিয়ে অবৈধ ভাবে বিদেশ ভ্রমণ, মব সৃষ্টি করে কলেজ দখল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে জোর পূর্বক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও হিসাব ও নিরিক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) -কে ফাঁকি দিয়ে ২০০৬ ও ২০১৫ সনের মিনিষ্ট্রি অডিটের ব্রডসিট জবাব না দেওয়া তার পরিপ্রেক্ষিতে বিগত ইংরেজি মাওশি কর্তৃক ৩৭.০২.০০০০.১০৫.০১.১৭.২০২৬.১১১, তারিখ – ৩১/০৩/২০২৬ ইং পত্র মোতাবেক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালী ব্রড সিট জবাব প্রেরনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছে, কলেজের সাধারন, বি এম ও ডিগ্রি শাখার শিক্ষার্থীদের ফর্ম পুরনের টাকা বর্তমান অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, অবৈধ সভাপতি ও অবৈধ শিক্ষক প্রতিনিধি দ্বয় টাকা আত্মসাত করেছে এবং মিনিষ্ট্রী অডিটে ঘুষ বানিজ্য পঁচিশ লক্ষ টাকা ও দুদক এর তদন্ত রোধের জন্য ভূয়া কাগজ পত্র তৈরির অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালীর স্বাক্ষর জাল করে এবং পূর্ববর্তী গভর্নিং বডি সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ, টপসিট, রেজুলেশন বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন এর চিঠিপত্র তৈরি এর মহোৎসব চলছে ।

জালিয়াতির হোতা ও ‘মব’ সৃষ্টিকারীঃ-

ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে ইংরেজি বিভাগের খণ্ডকালীন প্রভাষক এ এইচ এম মাহাবুবুর রহমান শামীমের নাম। ২০০৬ সালে এক অডিট চলাকালীন ২৬-২৭ জন সহকর্মীর স্বাক্ষর জাল করে তিনি তৎকালীন কমিটির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেন, যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়। সে সময় তিনি ক্ষমা চেয়ে অঙ্গীকারনামা দিলেও পরবর্তী সময়ে আবারো তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও স্বাক্ষর জালিয়াতির প্রমাণ পায় কলেজ কর্তৃপক্ষ।

গত ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, এই জালিয়াতি চক্রটি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ‘মব’ সৃষ্টি করে কলেজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ (রিট পিটিশন নং ১২৫৩২/২৪) অমান্য করে অবৈধ কমিটি গঠন ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।

লুটপাট ও নথিপত্র চুরির মহোৎসব

গত ২৩ অক্টোবর ২০২৪ রাতে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তাইফুজ্জামান, মাহাবুবুর রহমান শামীম ও তাদের সহযোগীরা মিলে অধ্যক্ষের কক্ষের তালা ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, ল্যাপটপ এবং মূল নথিপত্র লুট করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ডিআইএ অডিট চলাকালেও আলমারি ভেঙে দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যক্তিগত নথি ও কলেজের চেক বই, অধ্যক্ষের চেক বই, ব্ল্যাংক স্ট্যাম্প, মুল টপসিট ও খাতা পত্র, ডিগ্রি ও অনার্স নিয়োগ কৃত শিক্ষক কর্মচারীদের নিয়োগ সবক্রান্ত রেজুলেশন খাতা এবং ১৬ জন যাচাই কৃত শিক্ষক কর্মচারীর জাল সার্টিফিকেট এর প্রমান পত্র ও এর তথ্য উপাত্ত এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে বিদেশ ভ্রমণের সকল ডকুমেন্ট তথা পাসপোর্ট, ভিসার কপি স্ব স্ব ফাইল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে জালিয়াতির প্রমাণ লোপাট করা যায়। এই ঘটনায় আদালতে একাধিক ফৌজদারি মামলা ও সোনাডাঙ্গা থানায় জিডি করা হয়েছে, যার মামলা নং ১) মামলা নং- ১২৫৩২/২৪, তারিখ – ২৮/১০/২০২৪, ২) মামলা নং ৯৩/২০২৫ তারিখ ২৩/০৬/২০২৫, ৩) মামলা নং ১২৫৩২/২৪, তারিখ ২৮/১০/২০২৪, ৪) মামলার নং ৩৪/২৫, তারিখ -১৩/০৩/২০২৫, ৫) মামলার নং ৭০১/২৫, তারিখ ২০/০৫/২০২৫, ৬) মামলার নং ৮২৩/২৫ তারিখ -২৫/০৬/২০২৫, ৭)মামলার নং ৯২১/২৫, তারিখ ২২/০৭/২০২৫, ৮) মামলার নং ৭২/২৫, তারিখ ৩১/০৭/২০২৫, ৯) মামলা নং – ১১১১/২৫, তারিখ – ২৭/০৮/২০২৫, ১০) মামলা নং ১০২/২৫, তারিখ – ১২/১০/২০২৫। ইতিমধ্যে আরও বেশ কয়েকটি মামলা দ্বায়ের হইয়াছে যাহা চলমান এবং বর্তমান নতুন মামলা সহ ২৪ টি মামলা চলমান। কিছু মামলার নম্বর ও তারিখ গোপনীয়তা রক্ষার্থে তথ্য পেশ করা হইল না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানায় জি ডি নং বিগত ইংরেজি ০১/০২/২০২৬ তারিখ যার জি ডি নং ৫৭, ইংরেজি ২২/০১/২০২৬ তারিখ যার জি ডি নং ১৬০১।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের ও প্রাণনাশের হুমকিঃ-

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ জনাব দিবাকর বাওয়ালী, যিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তিনি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জালিয়াতি চক্রটি তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা এবং তার মেয়েকে অপহরণের হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ। বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় প্রাণভয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাছাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপনে কোন প্রতিষ্ঠান প্রধানের বেতন বন্ধ করা যাবে না মর্মে নির্দেশ থাকলেও মব সৃষ্টির মাধ্যমে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কলেজের একটি চক্র বিগত সেপ্টেম্বর ২০২৪ হতে ২০২৬ বর্তমান মাস পর্যন্ত বেতন ভাতা বন্ধ রেখেছে। এমনকি অবৈধ ভাবে বেতন ভাতা বন্ধ রেখেও বিধি মোতাবেক অর্ধ বেতন অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। যাহা বেআইনি বিধি বহির্ভূত।শিক্ষা মন্ত্রণালয় মহা পরিচালক ডিআইএ বরাবর তিনি কয়েকবার আবেদন দাখিল করিয়াছেন।কিন্তু কোন ফলাফল না আশার কারনে তিনি মহামান্য হাইকোর্টে এবং বিজ্ঞ জজ আদালতে মামলা দ্বায়ের এর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। মব সৃষ্টির কারনে অবৈধ সভাপতি সহ অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও দুষ্কৃতিকারী কয়েকজন শিক্ষক মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং- ৩৬৫৭/২০১৫ এর রায় আদেশ বাস্তবায়ন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, বেসরকারি মাধ্যমিক – ১, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা, স্মারক নং – ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৩১.০০৭.১৫.৬৯৪, তারিখ ০৬/০৮/২০১৭ ইং। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত ষাট দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হল অন্যথায় তাহা বাতিল বলিয়া গণ্য হবে যাহা তারা বিধি লঙ্ঘন করিয়াছে। কলেজের অবৈধ সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ পারভেজ বাবুর ছত্রছায়ায় এই চক্রটি কলেজে চাঁদাবাজি ও লুটপাট চালাচ্ছে। এমনকি সরকারি প্রজ্ঞাপন অমান্য করে গত কয়েক মাস ধরে বৈধ অধ্যক্ষের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে।

ভূয়া পদবী ব্যবহার করে প্রতারনার মাধ্যমে যশোর বোর্ড কর্তৃক এইচএসসি পরীক্ষা-২০২৪ এর পরীক্ষার খাতা সহকারী অধ্যাপকের পদ ব্যবহার করে প্রধান পরীক্ষক হওয়াঃ –

অত্র কলেজের ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক এ এইস এম মাহাবুবুর রহমান শামীম ও বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মাহাবুবুর রহমান মোড়ল ২০২৪ সনের পাবলিক পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষক হওয়ার নিমিত্তে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তাইফুজ্জামান এর সহযোগীতায় অনলাইনে ভুয়া পদবী সহকারী অধ্যাপক এর পদ ব্যবহার করে যশোর বোর্ড কর্তৃক প্রধান পরীক্ষক হন যাহা জালিয়াতি এবং প্রতারণা । একজন শিক্ষক হয়ে এহেন নিকৃষ্ট কাজের সহিত তারা জড়িত।

 

ধ্বংসের মুখে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম সরকারি সম্পদ এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ৯ টি সরকারি প্রজেক্টর, ল্যাপটপ চুরি আত্মসাৎঃ-

এক সময় যে কলেজের বিএম শাখায় পাসের হার ছিল ১০০% এবং সাধারণ শাখায় ৭০%, বর্তমানে এই অরাজকতার কারণে পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬%-এ। ল্যাব থেকে ১১টি প্রজেক্টর ও ৯টি ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় ব্যবহারিক শিক্ষাও লাটে উঠেছে।

প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন

এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক এবং সিটি মেয়রসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ ও ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। বর্তমানে উচ্চ আদালত ও জজ কোর্টে কলেজ সংশ্লিষ্ট ২১টিরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে।

সচেতন মহলের দাবি, দুদকের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই বিশাল জালিয়াতি চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হলে সরকারের কোটি কোটি টাকা রক্ষা পাবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাবে।