বাংলাদেশ ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাম্য যোগ্যতা হীন অবস্থায় নিয়োগ নিয়ে জাল এমপিওভুক্তির অভিযোগে দুদক, ডিআইএ তদন্ত ১২ টির অধিক ফৌজদারি মামলার আসামি মেট্রোপলিটন কলেজ খুলনা এর অবৈধ ইংরেজি প্রভাষক, এবার NTRCA এর অধ্যক্ষ পদে দৌড় তদন্তে বিস্তর অনিয়মের চিত্র

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:০৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬
  • ১১৩ Time View

বিশেষ প্রতিনিধি , খুলনা : তথ্য গোপন করে NTRCA পরীক্ষায় উত্তীর্ণ; দুদক ও ডিআইএ’র তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা, কলেজে নৈরাজ্যের অভিযোগ

খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার সবুজবাগে অবস্থিত মেট্রোপলিটন কলেজ (EIIN: 117432) দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে আলোচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে কলেজটির ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক মাহাবুবুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্রে এমপিওভুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) এর অধীনে প্রতিষ্ঠান প্রধান (অধ্যক্ষ) পদে নিয়োগ পেতে তথ্য গোপন করে এমসিকিউ(MCQ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, মাহাবুবুর রহমান শামীম একসময় খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি জাল সনদ ও নথিপত্র তৈরি করে এমপিওভুক্ত হন।

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ২০০৬ সালে তিনি কলেজের ২৭ জন শিক্ষক-কর্মচারীর স্বাক্ষর জাল করেন। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং এমপিও বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, প্রভাবশালী মহলের চাপ, এমনকি অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকির মতো ঘটনাও ঘটে, যা তদন্ত কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়।

পরে সরকারি প্রজ্ঞাপনের আলোকে জাল সনদ ও অবৈধ নিয়োগের বিষয়টি পুনরায় তদন্তের আওতায় আনা হয়। কলেজের অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালীর ও দাতা সদস্য অধ্যক্ষ মোমিনুল ইসলামের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিদর্শন ও হিসাব নিরীক্ষা অধিদপ্তর (DIA) ২০২৫ সালের ২১ জুলাই তদন্ত পরিচালনা করে। একই বছরের ১২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৃথক তদন্ত শুরু করে, যা বর্তমানে চলমান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক তদন্তেই তার নিয়োগে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

অভিযোগ এখানেই থেমে নেই। মাহাবুবুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে কলেজে ঘুষ গ্রহণ, চাঁদাবাজি, সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং নারী শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। এক নারী কর্মচারী—মিতা ইয়াসমিনের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া কলেজে মব সৃষ্টি, মারামারি, অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কক্ষের তালা ভেঙে লুটপাট, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব এবং দুই শতাধিক ফাইল তছরুপের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নথির মধ্যে জালিয়াতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও ছিল।

কলেজটির শিক্ষার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর ৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় শিক্ষার্থীসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষক সংখ্যার তুলনায় শিক্ষার্থী কম—যা অবৈধ নিয়োগেরই ফল।

এদিকে, জাল সনদ ও অবৈধ এমপিওভুক্তির অভিযোগে আরও অন্তত ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদক, DIA এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিজি প্রতিনিধি ও বিষয় বিশেষজ্ঞদের স্বাক্ষর জাল করে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে অনেককে এবং অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে, কলেজের ৯টি সরকারি প্রজেক্টর ও ৭টি ল্যাপটপ আত্মসাতের অভিযোগে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তাইফুজ্জামান অবৈধ কমিটি ও কমিটির বিরুদ্ধে ২২টিরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে। সোনাডাঙ্গা থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—একাধিক ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার আসামি এবং জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে নতুন করে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন? সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

এদিকে জানা গেছে, অভিযুক্তের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত এবং অবৈধভাবে গ্রহণ করা সরকারি অর্থ ফেরত আদায়ের জন্য আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

(এই প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র, অভিযোগ ও চলমান তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে চূড়ান্ত সত্য উদঘাটিত হবে।)

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

কাম্য যোগ্যতা হীন অবস্থায় নিয়োগ নিয়ে জাল এমপিওভুক্তির অভিযোগে দুদক, ডিআইএ তদন্ত ১২ টির অধিক ফৌজদারি মামলার আসামি মেট্রোপলিটন কলেজ খুলনা এর অবৈধ ইংরেজি প্রভাষক, এবার NTRCA এর অধ্যক্ষ পদে দৌড় তদন্তে বিস্তর অনিয়মের চিত্র

Update Time : ০৪:০৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি , খুলনা : তথ্য গোপন করে NTRCA পরীক্ষায় উত্তীর্ণ; দুদক ও ডিআইএ’র তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা, কলেজে নৈরাজ্যের অভিযোগ

খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার সবুজবাগে অবস্থিত মেট্রোপলিটন কলেজ (EIIN: 117432) দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে আলোচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে কলেজটির ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক মাহাবুবুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্রে এমপিওভুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) এর অধীনে প্রতিষ্ঠান প্রধান (অধ্যক্ষ) পদে নিয়োগ পেতে তথ্য গোপন করে এমসিকিউ(MCQ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, মাহাবুবুর রহমান শামীম একসময় খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি জাল সনদ ও নথিপত্র তৈরি করে এমপিওভুক্ত হন।

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ২০০৬ সালে তিনি কলেজের ২৭ জন শিক্ষক-কর্মচারীর স্বাক্ষর জাল করেন। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং এমপিও বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, প্রভাবশালী মহলের চাপ, এমনকি অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকির মতো ঘটনাও ঘটে, যা তদন্ত কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়।

পরে সরকারি প্রজ্ঞাপনের আলোকে জাল সনদ ও অবৈধ নিয়োগের বিষয়টি পুনরায় তদন্তের আওতায় আনা হয়। কলেজের অধ্যক্ষ দিবাকর বাওয়ালীর ও দাতা সদস্য অধ্যক্ষ মোমিনুল ইসলামের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিদর্শন ও হিসাব নিরীক্ষা অধিদপ্তর (DIA) ২০২৫ সালের ২১ জুলাই তদন্ত পরিচালনা করে। একই বছরের ১২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৃথক তদন্ত শুরু করে, যা বর্তমানে চলমান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক তদন্তেই তার নিয়োগে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

অভিযোগ এখানেই থেমে নেই। মাহাবুবুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে কলেজে ঘুষ গ্রহণ, চাঁদাবাজি, সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং নারী শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। এক নারী কর্মচারী—মিতা ইয়াসমিনের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া কলেজে মব সৃষ্টি, মারামারি, অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কক্ষের তালা ভেঙে লুটপাট, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব এবং দুই শতাধিক ফাইল তছরুপের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নথির মধ্যে জালিয়াতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও ছিল।

কলেজটির শিক্ষার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর ৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় শিক্ষার্থীসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষক সংখ্যার তুলনায় শিক্ষার্থী কম—যা অবৈধ নিয়োগেরই ফল।

এদিকে, জাল সনদ ও অবৈধ এমপিওভুক্তির অভিযোগে আরও অন্তত ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদক, DIA এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিজি প্রতিনিধি ও বিষয় বিশেষজ্ঞদের স্বাক্ষর জাল করে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে অনেককে এবং অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে, কলেজের ৯টি সরকারি প্রজেক্টর ও ৭টি ল্যাপটপ আত্মসাতের অভিযোগে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ তাইফুজ্জামান অবৈধ কমিটি ও কমিটির বিরুদ্ধে ২২টিরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে। সোনাডাঙ্গা থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—একাধিক ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার আসামি এবং জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে নতুন করে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন? সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

এদিকে জানা গেছে, অভিযুক্তের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত এবং অবৈধভাবে গ্রহণ করা সরকারি অর্থ ফেরত আদায়ের জন্য আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

(এই প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র, অভিযোগ ও চলমান তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে চূড়ান্ত সত্য উদঘাটিত হবে।)