
ভাঙ্গা ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের মানুষ এখনো আবেগ নিয়ে গল্প করে মোঃ রশিদ বেপারীর কথা। বয়স মাত্র ৩২ বছর। বাবা পাছু বেপারীর ছেলে রশিদ যিনি ৯ বছর আগে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়।
বিদায়ের সময় পরিবারকে বলেছিলেন, “কিছুদিন কষ্ট করো মা, ভালো হয়ে যাবে সব।” কিন্তু সেই “কিছুদিন” ধীরে ধীরে রূপ নেয় ৯ বছরের দীর্ঘ অন্ধকারে।
প্রথমদিকে মাঝে মাঝে খবর এলেও হঠাৎ একসময় সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবার জানত না রশিদ বেঁচে আছেন, নাকি হারিয়ে গেছেন অজানার অন্ধকারে। খোঁজ নিতে নিতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন তার বাবা-মা।
রশিদের মা প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির উঠোনে বসে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন যেন এই বুঝি ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি।
পরিবারের সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে রশিদ পুলিশের হাতে আটক হন। জেলে থাকার সময় থেকেই তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। মুক্তির পর তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। অচেনা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, যেন নিজের নাম-পরিচয়ও ভুলে গেছেন।
এদিকে বাড়িতে চলছিল অপেক্ষা আর কান্না। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর শূন্যতার ভার সহ্য করতে না পেরে প্রায় চার বছর আগে ছেলেকে আর একবারও না দেখে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তার মা।
এরপর হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় এলোমেলো চুল, ক্লান্ত মুখ, শূন্য চোখে এক মানুষ রাস্তায় হাঁটছেন। নাজিমপুরের কয়েকজন তরুণ ভিডিওটি দেখে চমকে ওঠেন এ তো রশিদ!
শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। এলাকার যুবকেরা চাঁদা তুলে, বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে, খোঁজ নিতে থাকে। অবশেষে বহু চেষ্টার পর তারা রশিদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
যেদিন রশিদ বাড়ি ফিরলেন, পুরো গ্রাম ছুটে এল তাকে দেখতে। কিন্তু সেই ফিরে আসার আনন্দ মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে—যখন তিনি জানতে পারেন, তার মা আর বেঁচে নেই।
মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে রশিদ নিশ্চুপ। কোনো কথা নেই, কোনো কান্নার শব্দও নেই শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকা। যেন বহু বছরের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি এক মুহূর্তে ফিরে এসেছে।
এখন ২ শতাংশ জমিতে তিন ভাই দুই বোনসহ রশিদ ভাঙ্গার সেই ছোট্ট বাড়িতেই আছেন।সংসারে অভাব, চিকিৎসার সামর্থ্য নেই। তবুও গ্রামের মানুষ বলছে তিনি ফিরেছেন, এটাই বড় পাওয়া।
কিন্তু নাজিরপুরের মানুষ জানে এই ফেরা পুরো ফেরা নয়।
কারণ, যে মানুষটির জন্য ঘরে ফেরার সবচেয়ে বেশি মানে ছিল—সেই মা আর দরজায় দাঁড়িয়ে নেই।
Reporter Name 


















