বাংলাদেশ ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঘোষণা আছে, কাজ নেই: কোথায় থমকে গেল তিস্তার বাঁচা-মরার লড়াই?

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৫৮:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫৩ Time View

(উপদেষ্টার উদ্বোধনী ঘোষণার পরও মাঠে নেই কাজ; ক্ষোভে ফুঁসছে উত্তরের দুই কোটি মানুষ)

 

মন্জুরুল আহসান শামীম স্টাফ রিপোর্টারঃ উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের আজন্মের হাহাকার তিস্তা নদী। এক সময় যে নদী ছিল জীবনরেখা, উজান আর রাজনীতির নোংরা খেলায় তা এখন বিষফোঁড়া। বছরের পর বছর প্রতীক্ষার পর আশা জেগেছিল ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ঘিরে। খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন হবে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও তিস্তার বালুচরে পড়েনি কোনো কোদালের কোপ, দেখা মেলেনি কোনো যন্ত্রপাতির। এই নীরবতা কি তবে কোনো বড় ধরণের প্রতারণার ইঙ্গিত? ক্ষোভে ও হতাশায় এখন উত্তাল তিস্তা পাড়ের মানুষ।

 

প্রতিশ্রুতির ফাঁদে উত্তরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পাড়ের মানুষ শুনছে মহাপরিকল্পনার গল্প। প্রতিবারই স্বপ্ন দেখানো হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সময় এলেই শুরু হয় ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ। নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, ভারত-চীন-বাংলাদেশ ত্রিমুখী টানাপোড়েনে তিস্তাকে জিম্মি করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মরুভূমি হয়ে যায় মাঠ, আর বর্ষায় আগ্রাসী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসে হাজারো পরিবার। এবারের অন্তর্বর্তী সরকার যখন জানুয়ারি মাসে কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এবার হয়তো মুক্তি মিলবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে এখন বালু।

 

আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু অত্যন্ত কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বছরের পর বছর মানুষকে শুধু আশার বাণী শোনানো হচ্ছে। খোদ উপদেষ্টা ১ জানুয়ারি উদ্বোধনের কথা বললেন, অথচ আজ ১৭ দিন পার হয়ে গেল। মাঠে কোনো কাজ নেই। এটি কি অবহেলিত রংপুরাঞ্চলের মানুষের সাথে মুলা ঝোলানো নয়? এটি স্পষ্টত ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে এক ধরণের প্রতারণা।”

 

একই সুর স্থানীয় কৃষকদের কণ্ঠেও। সাহাবাজ গ্রামের কৃষক সোবহান মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “নদীত পানি নাই, আবাদ করমো ক্যামনে? বর্ষাত ঘর যায় নদীৎ। সরকার খালি কয় করমো, কিন্তু কবে করমো হেইডা আর কয় না। হামার কপাল কি কোনোদিন ফিরবে না?”

 

কেন এই নীরবতা? ঘোষিত তারিখ পার হওয়ার পরও কেন কাজ শুরু হলো না— এ নিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘কারিগরি ও নীতিগত’ দোহাই দিলেও মাঠ পর্যায়ের মানুষের ধারণা, পর্দার আড়ালের ভূ-রাজনৈতিক চাপেই থমকে আছে এই মহাপরিকল্পনা।

 

আন্দোলনের হুঁশিয়ারি নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে দেশে। এর মধ্যেই তিস্তা পাড়ের মানুষ জানিয়ে দিয়েছে, আর কোনো টালবাহানা সহ্য করা হবে না। নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নির্বাচনের পর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে রংপুরাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী এক অচল করে দেওয়ার মতো আন্দোলন শুরু হবে।

 

উত্তরাঞ্চলের মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন— আর কত লাশ পড়লে, আর কত ঘর নদীগর্ভে বিলীন হলে বাস্তবায়ন হবে এই মহাপরিকল্পনা? নাকি ঘোষণাই হবে শেষ গন্তব্য?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

ঘোষণা আছে, কাজ নেই: কোথায় থমকে গেল তিস্তার বাঁচা-মরার লড়াই?

Update Time : ১২:৫৮:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

(উপদেষ্টার উদ্বোধনী ঘোষণার পরও মাঠে নেই কাজ; ক্ষোভে ফুঁসছে উত্তরের দুই কোটি মানুষ)

 

মন্জুরুল আহসান শামীম স্টাফ রিপোর্টারঃ উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের আজন্মের হাহাকার তিস্তা নদী। এক সময় যে নদী ছিল জীবনরেখা, উজান আর রাজনীতির নোংরা খেলায় তা এখন বিষফোঁড়া। বছরের পর বছর প্রতীক্ষার পর আশা জেগেছিল ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ঘিরে। খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন হবে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও তিস্তার বালুচরে পড়েনি কোনো কোদালের কোপ, দেখা মেলেনি কোনো যন্ত্রপাতির। এই নীরবতা কি তবে কোনো বড় ধরণের প্রতারণার ইঙ্গিত? ক্ষোভে ও হতাশায় এখন উত্তাল তিস্তা পাড়ের মানুষ।

 

প্রতিশ্রুতির ফাঁদে উত্তরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পাড়ের মানুষ শুনছে মহাপরিকল্পনার গল্প। প্রতিবারই স্বপ্ন দেখানো হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সময় এলেই শুরু হয় ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ। নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, ভারত-চীন-বাংলাদেশ ত্রিমুখী টানাপোড়েনে তিস্তাকে জিম্মি করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মরুভূমি হয়ে যায় মাঠ, আর বর্ষায় আগ্রাসী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসে হাজারো পরিবার। এবারের অন্তর্বর্তী সরকার যখন জানুয়ারি মাসে কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এবার হয়তো মুক্তি মিলবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে এখন বালু।

 

আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু অত্যন্ত কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বছরের পর বছর মানুষকে শুধু আশার বাণী শোনানো হচ্ছে। খোদ উপদেষ্টা ১ জানুয়ারি উদ্বোধনের কথা বললেন, অথচ আজ ১৭ দিন পার হয়ে গেল। মাঠে কোনো কাজ নেই। এটি কি অবহেলিত রংপুরাঞ্চলের মানুষের সাথে মুলা ঝোলানো নয়? এটি স্পষ্টত ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে এক ধরণের প্রতারণা।”

 

একই সুর স্থানীয় কৃষকদের কণ্ঠেও। সাহাবাজ গ্রামের কৃষক সোবহান মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “নদীত পানি নাই, আবাদ করমো ক্যামনে? বর্ষাত ঘর যায় নদীৎ। সরকার খালি কয় করমো, কিন্তু কবে করমো হেইডা আর কয় না। হামার কপাল কি কোনোদিন ফিরবে না?”

 

কেন এই নীরবতা? ঘোষিত তারিখ পার হওয়ার পরও কেন কাজ শুরু হলো না— এ নিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘কারিগরি ও নীতিগত’ দোহাই দিলেও মাঠ পর্যায়ের মানুষের ধারণা, পর্দার আড়ালের ভূ-রাজনৈতিক চাপেই থমকে আছে এই মহাপরিকল্পনা।

 

আন্দোলনের হুঁশিয়ারি নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে দেশে। এর মধ্যেই তিস্তা পাড়ের মানুষ জানিয়ে দিয়েছে, আর কোনো টালবাহানা সহ্য করা হবে না। নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নির্বাচনের পর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে রংপুরাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী এক অচল করে দেওয়ার মতো আন্দোলন শুরু হবে।

 

উত্তরাঞ্চলের মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন— আর কত লাশ পড়লে, আর কত ঘর নদীগর্ভে বিলীন হলে বাস্তবায়ন হবে এই মহাপরিকল্পনা? নাকি ঘোষণাই হবে শেষ গন্তব্য?