
ক্রাইম প্রতিবেদকঃ সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় জুয়া ও মাদক চক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে এক ক্রাইম প্রতিবেদককে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আলোচিত জুয়াড়ি ও মাদক ব্যবসায়ী মজনু সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিবেদককে উদ্দেশ করে বলেন “১২ তারিখের পর দেখে নেব।”এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক মহলে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জিরো টলারেন্স ঘোষণার পরও প্রকাশ্যে জুয়া মাদক?
নবাগত পুলিশ কমিশনারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও দক্ষিণ সুরমার ভার্তখলা এলাকায় প্রকাশ্যে জুয়া ও মাদক ব্যবসা চলছেই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশ নাকি অভিযুক্তদের “খুঁজে পায় না”, অথচ তারা সবার চোখের সামনেই অবাধে চলাফেরা করছে।
থানা পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, ডিবির অভিযান সীমিত?
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ সুরমা থানার কদমতলী ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন ও সরাসরি জুয়ার বোর্ড এবং মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। ‘জাকুমুন্ড’ ও ‘শিলংতীর’ নামক অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ বিকেল আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কদমতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন ফাঁড়ি থেকে মাত্র ২৫০ গজ দূরে প্রতিদিন চলা জুয়ার বোর্ডগুলো কীভাবে অদৃশ্য থাকে?
আলোচিত জুয়া ও মাদক চক্র?
২৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভার্তখলা মসজিদ বাজারসংলগ্ন শরীফ মিয়ার কলোনি এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা, ইয়াবা এবং তীর শিলংতীর জুয়া পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, আলোচিত জুয়াড়ি মজনু ও তার স্ত্রী রহিমা সরাসরি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। রহিমার সহযোগী হিসেবে বনিজানাই এলাকার হাবিবের নামও উঠে এসেছে।
এলাকাবাসী আরও জানান, এসব স্পটে কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে উঠেছে, যার ফলে চুরি, ছিনতাই ও সামাজিক অবক্ষয় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
প্রশাসনের অভিযান ‘প্রতীকী’?
জেলা প্রশাসনের অভিযানে নতুন রেলস্টেশনের প্রবেশমুখে কয়েকটি জুয়ার বোর্ড ভেঙে দেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ এই অভিযান সাময়িক ও লোক দেখানো। নিয়মিত যৌথ অভিযান ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে কদমতলী ফাঁড়ির ইনচার্জের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সচেতন মহলের উদ্বেগ?
সচেতন নাগরিকদের মতে, জুয়া ও মাদক চক্র দমনে পুলিশ, ডিবি ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সাংবাদিকের রক্ত চায় কারা?
দক্ষিণ সুরমার ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যেন এখন আইনহীন জনপদ। ভার্থখলা মসজিদ বাজার সংলগ্ন এলাকায় দিনের আলোতেই চলছে গাঁজা, ইয়াবা ও জুয়ার রমরমা কারবার আর এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে আলোচিত জুয়াড়ি মজনু ও তার স্ত্রী রহিমা।
স্থানীয়দের ভাষায়, মসজিদ বাজারের পাবলিক টয়লেটের পাশেই বসে মাদকের আড্ডা, চলে তীর ও শিলংতীর জুয়া। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী বলছেন, “এটা আর গোপন কিছু না সবাই জানে, শুধু প্রশাসন জানে না!”
স্বামীর প্রভাব ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে, স্ত্রীর রাজত্ব ২৬ নম্বরে?
অভিযোগ অনুযায়ী, মজনু ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে প্রভাব খাটালেও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুরো মাদক জুয়ার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন তার স্ত্রী রহিমা। তার ছত্রছায়ায় বনিজানাই এলাকার হাবিবসহ একাধিক সহযোগী অবাধে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে এই চক্রকে এতদিন কে বা কারা রক্ষা করছে?
সংবাদই কি অপরাধ? সাংবাদিকদের ওপর হামলা?
মাদক–জুয়ার খবর প্রকাশ করাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সাংবাদিকদের জন্য। গত ২ নভেম্বর (রোববার) সন্ধ্যায় মার্কাস পয়েন্ট এলাকায় এক সাংবাদিককে একা পেয়ে মজনুসহ অর্ধশতাধিক লোক ঘিরে ধরে। অভিযোগ রয়েছে, “সংবাদ প্রকাশের অপরাধে” তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে চাপ দেওয়া হয়। কিশোর গ্যাং দিয়ে ভিডিও ধারণ করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বির হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচেন ওই সাংবাদিক। পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ফিরে যায়।
এখানেই শেষ নয়। একই দিন রাত ৯টার দিকে দক্ষিণ সুরমার সাদুর বাজার কেয়াঘাট বাশপালা মার্কেটের সামনে আরেক সাংবাদিককে একা পেয়ে মজনুগংরা হামলা চালায়। পুলিশকে খবর দেওয়ার ‘অপরাধে’ গালিগালাজ ও মারধরের চেষ্টা করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাশের দোকানে ঢুকে শাটার বন্ধ করে আত্মরক্ষা করেন।
প্রশ্ন প্রশাসনের দিকে?
প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, জুয়া খেলা, সাংবাদিকের ওপর হামলা সবই ঘটছে দিনের পর দিন। তাহলে দক্ষিণ সুরমার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি ঘুমিয়ে আছে? নাকি মজনু রহিমা চক্রের পেছনে আছে অদৃশ্য কোনো শক্তিশালী ছত্রছায়া?
এলাকাবাসীর ক্ষোভ?
এলাকাবাসীর ক্ষোভ এখন বিস্ফোরণের পথে। তাদের প্রশ্ন:
“মাদক ব্যবসায়ীর হাতেই কি এলাকার নিয়ন্ত্রণ থাকবে? সাংবাদিকরা সত্য লিখলেই কি লাঞ্ছিত হবে?”
দ্রুত সময়ের মধ্যে এই চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন সচেতন মহল।
Reporter Name 























