বাংলাদেশ ০৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের উত্তাপ ও জ্বালানি বাজারে অরাজকতা: প্রশাসনের নির্লিপ্ততা কাম্য নয়

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:৩৫:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ৭৬ Time View

মুহাম্মদ মহসিন আলীঃ

​বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশ এক গভীর জ্বালানি সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু এই জাতীয় সংকটকেও একদল অসাধু ব্যবসায়ী তাদের আখের গুছানোর হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডার থেকে শুরু করে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন—প্রতিটি খাতের অসাধু চক্র এখন সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে ব্যস্ত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকার নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে, আর মাঠ পর্যায়ে চলছে ‘ইচ্ছেমতো দাম’ আদায়ের মহোৎসব।

​জ্বালানি তেলের দাম সামান্য বাড়লে বা সরবরাহে সামান্য টান পড়লেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এদেশের মুনাফাখোরদের পুরনো কৌশল। বর্তমানে জেলা ও উপজেলার প্রান্তিক বাজারগুলোতে এলপিজি গ্যাসের নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা করছে না অধিকাংশ খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে মজুদ করে রেখে তেলের পাম্পগুলোতে ‘সরবরাহ নেই’ বলে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ পেছনের দরজা দিয়ে চড়া দামে সেই জ্বালানিই বিক্রি হচ্ছে। এই অরাজকতায় সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের জীবনযাত্রা সরাসরি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

​গুদামজাতকরণের মাধ্যমে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা হচ্ছে। ​নির্ধারিত দামের লঙ্ঘন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিইআরসি বা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রয়। ডিজেলের দামের কারসাজিতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকের সেচ খরচ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কম দামে জ্বালানি পণ্য কিনে অবৈধ ভাবে মজুত করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

​সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান তদারকির অভাব। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যদি নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার না করে, তবে এই সুযোগ সন্ধানীদের নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কেবল ঢাকায় বসে নির্দেশনা জারি করলে তার সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। প্রশাসনের এই নির্লিপ্ততা অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও সাহসী করে তুলছে, যা প্রকারান্তরে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে।

​আমরা মনে করি, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে মজুদদারদের চিহ্নিত করতে হবে এবং কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেবল জরিমানা নয়, প্রয়োজনবোধে অসাধু সিন্ডিকেটের লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ড প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

​সবশেষে, জনভোগান্তি লাঘবে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সরাসরি মাঠে নামতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে সঠিক মূল্যে জ্বালানি পায়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই জ্বালানি সংকট জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। আমরা আশা করি, প্রশাসন দ্রুত তন্দ্রা কাটিয়ে জনস্বার্থে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।

মুহাম্মদ মহসিন আলী
সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা
বিজয়নগর ব্রাহ্মণবাড়িয়া

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

jogo hosterbd

Popular Post
error: Content is protected !!

যুদ্ধের উত্তাপ ও জ্বালানি বাজারে অরাজকতা: প্রশাসনের নির্লিপ্ততা কাম্য নয়

Update Time : ০৩:৩৫:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

মুহাম্মদ মহসিন আলীঃ

​বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশ এক গভীর জ্বালানি সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু এই জাতীয় সংকটকেও একদল অসাধু ব্যবসায়ী তাদের আখের গুছানোর হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডার থেকে শুরু করে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন—প্রতিটি খাতের অসাধু চক্র এখন সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে ব্যস্ত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকার নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে, আর মাঠ পর্যায়ে চলছে ‘ইচ্ছেমতো দাম’ আদায়ের মহোৎসব।

​জ্বালানি তেলের দাম সামান্য বাড়লে বা সরবরাহে সামান্য টান পড়লেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এদেশের মুনাফাখোরদের পুরনো কৌশল। বর্তমানে জেলা ও উপজেলার প্রান্তিক বাজারগুলোতে এলপিজি গ্যাসের নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা করছে না অধিকাংশ খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে মজুদ করে রেখে তেলের পাম্পগুলোতে ‘সরবরাহ নেই’ বলে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ পেছনের দরজা দিয়ে চড়া দামে সেই জ্বালানিই বিক্রি হচ্ছে। এই অরাজকতায় সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের জীবনযাত্রা সরাসরি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

​গুদামজাতকরণের মাধ্যমে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা হচ্ছে। ​নির্ধারিত দামের লঙ্ঘন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিইআরসি বা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রয়। ডিজেলের দামের কারসাজিতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকের সেচ খরচ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কম দামে জ্বালানি পণ্য কিনে অবৈধ ভাবে মজুত করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

​সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান তদারকির অভাব। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যদি নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার না করে, তবে এই সুযোগ সন্ধানীদের নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কেবল ঢাকায় বসে নির্দেশনা জারি করলে তার সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। প্রশাসনের এই নির্লিপ্ততা অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও সাহসী করে তুলছে, যা প্রকারান্তরে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে।

​আমরা মনে করি, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে মজুদদারদের চিহ্নিত করতে হবে এবং কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেবল জরিমানা নয়, প্রয়োজনবোধে অসাধু সিন্ডিকেটের লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ড প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

​সবশেষে, জনভোগান্তি লাঘবে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সরাসরি মাঠে নামতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে সঠিক মূল্যে জ্বালানি পায়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই জ্বালানি সংকট জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। আমরা আশা করি, প্রশাসন দ্রুত তন্দ্রা কাটিয়ে জনস্বার্থে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।

মুহাম্মদ মহসিন আলী
সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা
বিজয়নগর ব্রাহ্মণবাড়িয়া