
খুলনার উপকূলীয় কয়রা পাইকগাছা । চারদিকে নদী, “খাল আর জলাভূমিতে ঘেরা। সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে প্রকৃতির রূপ যেমন মনমুগ্ধকর, তেমনি তার রুদ্ররূপের কড়াল আঘাতও সইতে হয় স্থানীয়দের। উপকূলে প্রতিদিনের জীবন যেন একেকটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় যোদ্ধা হলেন নারীরা। বাতাসে লোনা গন্ধ, নদীর ঢেউ, ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক, জীবিকার অনিশ্চয়তা সবকিছু সামলে তারা প্রতিদিন নতুন শক্তিতে উঠে দাঁড়ান। উপকূলীয় বাসিন্দাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম মাছ ধরা, শুকনো মাছ প্রক্রিয়াজাত করা, নৌকা ও জাল তৈরিসহ নদীকে কেন্দ্র করে নানা কাজ। নদীই তাদের ভরসা আবার নদীই তাদের দুঃখের কারণ। এই জীবনযুদ্ধে পুরুষরা নদীতে যান মাছ ধরতে, আর ঘরের ভেতর ও বাইরে সব চাপ সামলান নারীরাই। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, লোনাজল বৃদ্ধি, দ্ধি, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম এবং নদীভাঙনের কারণে মানুষের জীবন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এসব বাস্তবতার মাঝেই প্রতিদিন দৃঢ় মনোবলে টিকে আছেন তারা। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই মৎস্যনির্ভর। নদীর মাছ ধরেই চলে বহু পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়ালেখা, দৈনন্দিন ব্যয় সবকিছু। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে জলবায়ুর পরিবর্তন এতটাই তীব্র হয়েছে যে মাছের সংখ্যা কমে গেছে দৃশ্যমানভাবে। লোনাজলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় ধান, শাকসবজি ও গাছপালা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষিকাজের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে নারীদের জীবনের চাপ দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে নারীরা কৃষিতে সহায়তা করে পরিবারের আয় বাড়াতে পারতেন, এখন সেখানে সেই সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে সিডর, আইলা, ফনি, বুলবুলের মতো ঘূর্ণিঝড়ে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলবেষ্টিত এই জনপদ। ঘূর্ণিঝড়ের পর নদীভাঙন, ঘরবাড়ি ক্ষতি, জালের ক্ষয়, নৌকা ডুবে যাওয়া এসব ক্ষতির অভিঘাতও সামলাতে হয় নারীদেরই। সুন্দর বনঘেরা জনপদে দেখা মিলল ছকিনা বেগমের। তার স্বামী একটি ছোট নৌকায় মাছ ধরেন।ছকিনা বেগম বলেন, স্বামী নদীতে গেলে কখন ফিরবে তার ঠিক থাকে না। ঝড় উঠলে পুরো রাত জেগে থাকি। কখনও নদীতে মোবাইল নেটওয়ার্কও থাকে না, তাই খোঁজ পাওয়া যায় না। যদি বৃষ্টি আর ঝড় বাড়ে, তখন মনে হয় আজ হয়তো আর ফিরবে না। লোনাজলের কারণে তাদের বাড়ির চারপাশের জমিতে এখন আর সবজি জন্মায় না। আগে পরিবারে নারীরা শাকপাতা চাষ করে সংসারে কিছুটা সাহায্য করত। এখন সেই সুযোগ হারিয়ে গেছে অনেকটাই। লোনাজলে সব নষ্ট হয়ে যায়। আগে বরই, পেয়ারা, নারিকেল কত গাছ ছিল! এখন গাছগুলোও শুকিয়ে গেছে। মোংলার হাসিনা খাতুন নামের এক নারী জানান, তার স্বামী আগে প্রতিদিনই মাছ নিয়ে ফিরতেন, এখন সপ্তাহে দুই-তিনদিনও মাছ মেলে না। ‘মাছ না পেলে আমি শুকনো মাছ বিক্রি করি। কখনও কাজ পাই, কখনও পাই না। সংসারের সব চাপ আমার ওপর এসে পড়ে। কিন্তু পিছু হটার উপায় নেই। এভাবেই চলতে হয়।’ হাসিনা আরও বলেন, আগের মতো শীতকাল নেই। গরম বছরজুড়েই থাকে। এতে মাছ কমে গেছে। আবার ঝড় হলে আমরা সবার আগে বাড়িছাড়া হই। ফিরে এসে দেখি ঘরের এরের জিনি জিনিসপত্র নষ্ট, উঠানের গাছপালা নষ্ট, জাল নষ্ট। সব নতুন করে শুরু করতে হয়। শিবসা নদীঘেরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করেন সালেহা বেগম। দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে তার সংসার। স্বামী জীবিকার জন্য বেশিরভাগ সময় সমুদ্রে থাকে। পরিবারের সব কাজ তাকে করতে হয়। সব কাজের মধ্যে প্রতিদিনের সুপেয় পানি সংগ্রহ তার জন্য সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। সালেহা বেগম বলেন, আমার স্বামী সমুদ্রে থাকে বেশিরভাগ সময়। ঘরের সব কাজ আমার ওপর, আর এর মধ্যে সবচেয়ে কষ্টের হলো পানির ব্যবস্থা। বাড়ির পাশে একটি রেইনওয়াটার ট্যাংক আছে, সেখানে লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়। কখনও দুই ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয়। কখনও পানি ফুরিয়ে যায়। তখন আবার আরও দূরে যেতে হয়। তিনি আরও বলেন, আমরা মেয়েরা পানি আনতে আনতেই ঘরের কাজের অর্ধেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। তবু পানি ছাড়া তো বাঁচা যায় না। জলাভূমির মাঝে থেকেও পানির এমন অভাব এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট। কয়রা উপজেলার বেদকাশী গ্রামের রোকেয়া খাতুন বলেন, আমরা সব সময় নদীর ওপর নির্ভরশীল। আমার স্বামীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে আমিও যাই নদীতে মাছ মারতে। আগে নদীতে বেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন সারারাত জাল ফেলেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়। এখন সংসারে খরচ বাড়ছে, আয় কমছে। কিন্তু নদী ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। তবে নারীদের নদীতে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নদীতে জোয়ার-ভাটা, বৃষ্টি, ঢেউ সবই বিপজ্জনক। যেতে ভয় লাগে। কিন্তু ভয় করে কি আর জীবন চলে? পরিবার চালানোর জন্য সব করতে হয়, তবুও জীবিকার তাগিদে এই নদীই আমাদের সব। তাই ঝুঁকি নিতেই হয়। তিনি আরো বলেন, উপকূলীয় নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার। লোনাজলের বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, খাদ্য ও পানি সংকট, আয়ের অভাব এসব চ্যালেঞ্জ সরাসরি আঘাত করে তাদের জীবনে। পুরুষেরা স্বাভাবিক কাজ চালালেও নারীদের জন্য সুযোগ কমে যায়। ফলে তাদের বোঝা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, মিঠাপানির ব্যবস্থাপনা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং বিকল্প জীবিকা তৈরি করা জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে উপকূলের নারীদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। লেখকঃ এড এফএমএ রাজ্জাক একজন সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, পাইকগাছা, খুলনা। মোবাঃ 01711-0725251
Reporter Name 
























